ঠিক কীকারণে-কীভাবে শুরু হয়েছিল কলকাতা পুলিশের গোয়েন্দা বিভাগ?

কলকাতা পুলিশের গোয়েন্দা বিভাগ শুরুর নেপথ্যে ছিল একটি রোমহর্ষক হত্যাকাণ্ড

১৮৬৮ সালের ১ এপ্রিল, এই তারিখেই কলকাতায় রোজ ব্রাউন নামে এক অ্যাংলো-ইন্ডিয়ান সুন্দরী মহিলা খুন হন, খুব সূক্ষভাবে তাঁর গলায় পোঁচ দেওয়া হয়েছিল। আমহার্স্ট স্ট্রিট পুলিশ স্টেশন থেকে মিনিট খানেকের দূরত্বে, গভীর রাতে একজন টহলদার কনস্টেবল তাঁর লাশ দেখতে পান। লাশটির অবস্থান থেকে পরিষ্কার বোঝা গেছিল যে, আক্রমণের সময় মহিলা দৌড়াচ্ছিলেন বা হাঁটছিলেন, সম্ভবত খুনির হাত থেকে পালানোর চেষ্টা করেছিলেন।

খুনের ঘটনাটির এত পুঙ্খানুপুঙ্খ বর্ণনা দেওয়ার একমাত্র কারণ এই যে, এই মৃত্যু জড়িয়ে রয়েছে কলকাতার একটি ইতিহাসের সঙ্গে; রোজ ব্রাউনের মৃত্যু কলকাতার এমন একটি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে জড়িয়ে গেছিল, যেটি দেশের সেরা প্রতিষ্ঠানগুলির মধ্যে অন্যতম হয়ে উঠেছিল, সম্ভবত সেটাই ছিল প্রথম – কলকাতা পুলিশের গোয়েন্দা বিভাগ। সেই প্রসঙ্গেই আসব এবার।

রোজ-হত্যার ঘটনাটি সেসময় কলকাতায় তীব্র আলোড়ন ফেলেছিল, তাই এ নিয়ে বেশি জলঘোলা করার প্রয়োজন আছে বলে মনে হয় না। এই ধরনের ঘটনা শহরে প্রথম ঘটেছিল এমনটা নয়, তবে বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই সেগুলো ঘটতো মাতালদের ঝগড়া, গোষ্ঠীদ্বন্দ্ব অথবা কোনও রাজনৈতিক ষড়যন্ত্রের কারণে। তবে, পুলিশ স্টেশনের এত কাছাকাছি থাকা, একজন সুসজ্জিত সুন্দরী মহিলার এহেন রোমহর্ষক খুনের সঙ্গে এমন কিছু জড়িয়ে ছিল, যা কলকাতার ভিত্তি নাড়িয়ে দিয়েছিল। মধ্যবিত্ত থেকে শুরু করে অভিজাত, সম্ভ্রান্ত সংবাদপত্রের কলাম থেকে শুরু করে জনাকীর্ণ বাজার পর্যন্ত এই হত্যাকাণ্ড আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু হয়ে উঠেছিল।

কারো কারো ক্ষোভ সরাসরি পুলিশের উপর গিয়ে পড়েছিল, আবার কেউ কেউ যুক্তি দিয়ে বিষয়টা ব্যাখ্যা করতে চেয়েছিলেন।  ঘটনার এক সপ্তাহ পরেও, আমহার্স্ট স্ট্রিট থানার পুলিশ নিহত মহিলাকে সনাক্ত করতে পারে না অথচ, ততক্ষণে শহরের প্রত্যকটি বড়ো খবরের কাগজে রোজ-এর ছবি বেরিয়ে গেছিল। অসহিষ্ণু জনতার ক্ষোভ এবং সংবাদমাধ্যমের নিরন্তর সমালোচনায় কলকাতা পুলিশের ব্যবস্থাপনা এবং তাদের অত্ত্বাবধানে নাগরিক সুরক্ষা, দুই-ই সন্দেহের মুখে পড়ে; অবশেষে তৎকালীন পুলিশ কমিশনার স্যার স্টুয়ার্ট সান্ডার্স হগ-এর ধৈর্যের বাঁধ ভাঙে এবং অত্যন্ত রেগে গিয়ে তাঁর সহকারিকে চিঠি পাঠিয়ে পুলিশের অক্ষমতা নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করেন।

তিনি কতটা রেগে গেছিলেন সেটা বিষয় নয়, হগ ধীরে ধীরে বুঝতে পেরেছিলেন যে, রোজ ব্রাউন হত্যার রহস্য উন্মোচন করতে না পারা শুধুমাত্র তার নিজের দুর্বল নেতৃত্বকে প্রতিফলিত করবে না, প্রতিটি নাগরিকের মনে পুলিশের কার্যকারিতা নিয়ে সন্দেহের বীজ বপন করবে। বেশ স্পষ্টতই, সেই সময়টা এসে পৌঁছেছিল, যখন পুলিশ স্টেশন এবং তার এখতিয়ারের বাইরে এমন একটি বিচারব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার পথ প্রশস্ত হচ্ছিল, যা কোনও নির্দিষ্ট থানার উপর নির্ভর করবে না উপরন্তু, অস্বাভাবিক ও জটিল অপরাধ সমাধানে নিবেদিত একটি দল গঠন করবে।

এইবার ঘটনায় প্রবেশ করেন দারোগা রিচার্ড রীড, তদন্তের নেতৃত্ব দেওয়ার জন্য হগ এঁর কথাই ভাবেন। ৩০-এর দশকের গোড়ার দিকেই রীড খ্যাতি অর্জন করেছিলেন দ্রুত চিন্তার দক্ষতা, তীব্র পর্যবেক্ষণ এবং কঠোর পরিশ্রমের জন্য। এইসব গুণাবলী নিয়ে তাঁর খুব বেশি সময় লাগেনি রোজ ব্রাউনকে সনাক্ত করতে, শুধু তাই নয়, কীভাবে তাঁকে হত্যা করা হয়েছিল তার একটি তত্ত্ব গঠন করেন তিনি এবং সন্দেহভাজনদের একটি তালিকাও তৈরি করেন।

কীভাবে তিনি এই হত্যাকাণ্ডের নিষ্পত্তি করতে পেরেছিলেন সেটা অন্য গল্প, তবে এই তদন্তের সাফল্য তাঁকে রাতারাতি তারকা বানিয়ে দেয়, কলকাতার প্রথম 'পুলিশ গোয়েন্দা' হিসাবে অভিষেক হয় তাঁর এবং অপরাধের দ্রুত ও নিপুণ তদন্তের জন্য কলকাতার একটি বিশেষ বিভাগ দরকার, হগের এই বিশ্বাসকে আরও দৃঢ় করে তোলেন।

(পরবর্তী অংশ আসছে…)

Post Tags
Developed by DXDasia