
“এটা নির্ভেজাল সিনেমা, এ দেশে যে সিনেমা হত তার থেকে একেবারে আলাদা”- সত্যজিৎ রায়
রাজস্থানে জন্ম হলেও মনে-প্রাণে ছিলেন পুরোদস্তুর বাঙালি। উদয়শঙ্কর চৌধুরী পুরো নাম, পরবর্তীকালে উদয়শঙ্কর। বাবা ছিলেন অধুনা বাংলাদেশের যশোরের মানুষ। জীবনের প্রথম পর্যায়ে কিন্তু উদয়শঙ্কর নাচ শুরু করেননি। বরং সংগীত এবং আলোকচিত্র শিল্পের দিকেই তাঁর বেশি নজর ছিল। নাচ এসেছিল সহজাতভাবেই। উদয়শঙ্কর যখন লন্ডন কলেজ অফ আর্টস-এ ভর্তি হলেন, সেখানেই প্রাচ্য ও পাশ্চাত্যের মেলবন্ধনে শাস্ত্রীয় নৃত্যশৈলী কীভাবে ধারণ করা যায়, তা শিখেছিলেন। জেনেছিলেন তত্ত্ব ও তথ্য। ওই যে ছোটোবেলায় জেনেছিলেন ফটোগ্রাফির ফ্রেম, সেখান থেকেই হয়তো জন্ম নিয়েছিল ‘কল্পনা’র কল্পনাশক্তি। সিনেম্যাটিক ফ্রেম তাঁকে ভাবিয়েছিল আজীবন। আর তাই হয়তো শঙ্কর ঘরানার নাচে অনায়াসে চলে আসে বডি এক্সপ্রেশন। যেখানে মুদ্রার থেকেও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে শরীরী ভাষা।
চল্লিশের দশকের গোড়ায় উদয়শঙ্কর ঠিক করলেন শাস্ত্রীয় নৃত্যশৈলীর উপর একটি চলচ্চিত্র নির্মাণ করবেন। আর সেই চলচ্চিত্রের প্রধান চরিত্রে থাকবে শুধু নাচ, কোনো মানুষ নন। তাঁর সেই চিন্তাভাবনা আলোর মুখ দেখেছিল ১৯৪৮ সালে। এটিই তাঁর একমাত্র চলচ্চিত্র। অমলাশঙ্কর এই ছবিতে অভিনয় করেছিলেন। ছবিটি দর্শকমহলে তেমন সাড়া পায়নি। কিন্তু পরবর্তীকালে সমালোচকমহলে ঝড় তুলেছিল ‘কল্পনা’। এ প্রসঙ্গে মনে পড়ে যায় একটি ঘটনা।

সত্যজিৎ রায়ের উপর ভার পড়ল উদয়শঙ্করকে নিয়ে একটি লেখা দিতে হবে আনন্দ গোষ্ঠীকে। তখন এক সাংবাদিককে নিজের বিশপ লেফ্রয় রোডের বাড়িতে ডেকে সত্যজিৎবাবু জানিয়েছিলেন, “উদয়শঙ্করের উপরে ইস্যু করছেন বলেই ডেকে পাঠালাম, না হলে আমি এখন যা ব্যস্ত তাতে লেখার সময় বার করাই কঠিন। …উদয়শঙ্করের একটা জিনিস সকলের জানা দরকার, সেটা ওঁর করা একটা সিনেমা, ‘কল্পনা’। …আমি ভেবেছিলাম নৃত্যশিল্পী হিসাবে তিনি যতই মহান হন, সিনেমা সম্বন্ধে তাঁর কতটা ধারণা থাকা সম্ভব? ছবিটা রিলিজের দিনই আমি দেখেছি। দেখলাম এটা নির্ভেজাল সিনেমা, এ দেশে যে সিনেমা হত তার থেকে একেবারে আলাদা। কম্পোজিশন, আলোর ব্যবহার, ক্যামেরার অ্যাঙ্গেল ভীষণ সাবলীল। আমি এই সিনেমাটা দেখেছিলাম মোট এগারো বার। …‘কল্পনা’র কদর আমাদের দেশে ক’জনই বা করতে পেরেছেন?”
উদয়শঙ্করের ‘কল্পনা’ এরকমভাবেই ঘোর লাগিয়েছিল তাবড় তাবড় সমালোচকমহলে। আজ উদয়শঙ্করের ১১৯তম জন্মদিন। তাঁর প্রতি বঙ্গদর্শনের শ্রদ্ধার্ঘ্য।
