উড়ন্ত তারাদের ছায়া : বাংলার নাট্যমঞ্চে মুঘল ইতিহাস ও ‘বিশ্বাস’-এর উদযাপন

সংস্তব প্রযোজিত ও দেবাশিস নির্দেশিত নাটক ‘উড়ন্ত তারাদের ছায়া’

কটি শিল্প আদতে কী করে? কী করায়? সে কি শুধু আনন্দ দেয়? শুধু হাসায়-কাঁদায়? না কি সে ভাবে-ভাবায়? আচ্ছা, ইন্টারডিসিপ্লিনারি শিল্পে কী হয়? সে কি মিলিয়ে দেয় বিজ্ঞান, সমাজ, ইতিহাসকে? না কি অন্য কোথাও, অন্য কোনোখানে গিয়ে ধাক্কা দেয় অন্য কোনোকিছু? অ্যারিস্টটল তাঁর কাব্যতত্ত্ব বইতে বলেছিলেন, ইতিহাসের থেকে নাটক (আরও নির্দিষ্টভাবে বলতে গেলে ট্রাজেডি) একটি জায়গাতেই অনেকটা এগিয়ে যায়। ইতিহাসের কারবার একমাত্র যা ঘটে সেটুকুকে নিয়ে, সাহিত্য তথা নাটক সেই ইতিহাসের সঙ্গে কল্পনা মিশিয়ে হয়ে উঠতে পারে সত্যর থেকেও বেশি সত্য, হয়ে উঠতে পারে পূরণকারক সত্য। আজ এত হাজার বছর পরে যখন বাংলার নাট্যমঞ্চে কোনো ইতিহাস শিল্পের মাধ্যমে হয়ে উঠতে পারে পূরণকারক সত্য, তখন দর্শকদের মন সেই ‘কবির মনভূমি’-র মতোই সত্যকে সাদরে গ্রহণ করে।

যে কোনো শিল্পের চূড়ান্ত অবস্থা অবশ্যই তার বিমূর্ততার মধ্যে বলে মনে করি। সেক্ষেত্রে যখন নাটকে মঞ্চে একা নাদির শাহ দাঁড়িয়ে থাকেন ও আকাশ থেকে তারা নেমে আসে তার গায়ে, শরীরে; তখন যে বিমূর্ততা তৈরি হয়, সেটি এই নাটকের সম্পদ বলে মনে করি।

এই গল্প ইতিহাসের দুই ভুলে যাওয়া নায়ক ও খলনায়ককে নিয়ে, সম্রাট মোহাম্মদ শাহ ও বিদেশি শাসক (তথা দস্যু) নাদির শাহকে নিয়ে। এটা কার গল্প এখানে বলার কোনো প্রয়োজন আছে বলে মনে হয় না। নাটকটি বেশ পুরোনো, মঞ্চে এর বয়স প্রায় দুই বছর হতে চললো। ইতিমধ্যে অনেক লেখালিখি এই নাটক নিয়ে হয়ে গিয়েছে। সংস্তব নাট্যদলের উড়ন্ত তারাদের ছায়া, আজ একটু অন্যভাবে দেখার চেষ্টা করবো।

এটি দেবাশিসের নাটক। এই মুহূর্তে দর্শন চৌধুরী বা দুর্গাশঙ্কর মুখোপাধ্যায়ের পরবর্তী যুগের কোনো গবেষক যদি আবার বাংলা থিয়েটারের ইতিহাস লিখতে বসেন, তাহলে ২০১০ পরবর্তী বাংলা থিয়েটারের ইতিহাস যে নামটি ছাড়া লেখা হওয়া প্রায় অসম্ভব, সেটি হল দেবাশিস। যে ব্যক্তিকে নিয়ে, কেবল তাঁর রচিত ও নির্দেশিত নাটক দিয়ে একটি গোটা নাট্য-উৎসব হয়ে যেতে পারে কলকাতা শহরে, যাঁর নাটক দেখতে হলে ঢোকার জন্য একাডেমির পোর্টিকো থেকে মেন গেট পর্যন্ত লাইন পড়ে দর্শকের, তিনি দেবাশিস। ‘উড়ন্ত তারাদের ছায়া’ ও ‘প্রথম রাজনৈতিক হত্যা’ (বিপ্লবী কানাইলাল দত্ত ও আলিপুর বোমা মামলা সংক্রান্ত বিষয় নিয়ে অন্য থিয়েটার প্রযোজিত নাটক) নিয়ে কথা বলার সময় দেবাশিস একবার আমায় ব্যক্তিগতভাবে বলেছিলেন, প্রথম রাজনৈতিক হত্যা, উড়ন্ত তারাদের ছায়া-র সাপেক্ষে ‘টোটাল থিয়েট্রিকাল ভ্যালু’ দিক দিয়ে বেশি ভালো কাজ। এ কথা দেবাশিস বলতেই পারেন কারণ দুটোই ওঁর সন্তান। তবে উড়ন্ত তারাদের ছায়া-কে এগিয়ে রাখা যায় এর টেক্সট, সংলাপ, সংগীত, আলো, সর্বোপরি এর অভিঘাতের দিক থেকে।

মুঘল সাম্রাজ্যের একজন আপাত অযোগ্য শাসক মোহাম্মদ শাহ-এর শাসনকালে দিল্লি ও ভারত লুঠ করতে আসেন নাদির শাহ, তবে তিনি মোহাম্মদ, বলা ভালো ভারত থেকে নিয়ে যান ‘বিশ্বাস’। এই বিশ্বাসের কাহিনিই ঘেঁটে যায় নাটকের দ্বিতীয় অর্ধে। নাদির অনুমান করেন তার বড়ো ছেলে রেজা কোলি তাকে মারতে চায়, এই অনুমান ও অবিশ্বাস থেকে তিনি ছেলের চোখ খুবলে নেন এবং শেষে নিজের বিশ্বস্ত মানুষজন, যাদের তিনি বিশ্বাস করতেন, সেই মানুষজনের হাতেই নাদিরকে মরতে হয়। তাহলে এই নাটকে ট্রাজেডি কার? নাদিরের? না কি ‘বিশ্বাস’-এর? উত্তর জানা নেই।

নাটকটিতে অনেক কিছু আছে। এই মুহূর্তে বাংলা কনটেম্পোরারি থিয়েটারের মঞ্চনির্মাণের অন্যতম মূল উপাদান দড়ি ও জাল-কে যে সুন্দর উপায়ে ব্যবহার করে মঞ্চটিকে তিনটি ভাগে ভাগ করেছেন দেবাশিস, সেটি অবশ্যই প্রশংসাযোগ্য। সঞ্জীব সরকার, তথাগত প্রমুখ অভিনেতাদের নিয়ে আগে বহুবার বহু লেখায় কথা হয়েছে, তাঁদের অভিনয়ের আবারও প্রশংসা করছি।

সম্প্রতি কৃত্তিবাস পত্রিকায় এই নাটক সংক্রান্ত একটি লেখায় নাটকটির প্রশংসা করার পরেও বিভাস চক্রবর্তী এক জায়গায় বলেছেন, মঞ্চটিকে নাটকের কিছু বিশেষ মুহূর্তে তারাখচিত করে দেওয়া ওঁর পছন্দ হয়নি। বিভাসবাবু প্রাজ্ঞ ও বিদগ্ধ নাট্যব্যক্তিত্ব, বাংলা থিয়েটারের অভিভাবকসম। তবে একজন দর্শক হিসেবে বিভাসবাবুর এই কথাটির সঙ্গে আমি একমত হতে পারছি না। যে কোনো শিল্পের চূড়ান্ত অবস্থা অবশ্যই তার বিমূর্ততার মধ্যে বলে মনে করি। সেক্ষেত্রে যখন নাটকে মঞ্চে একা নাদির শাহ দাঁড়িয়ে থাকেন ও আকাশ থেকে তারা নেমে আসে তার গায়ে, শরীরে; তখন যে বিমূর্ততা তৈরি হয়, সেটি এই নাটকের সম্পদ বলে মনে করি।

নাটকের একদম শেষদিকে মঞ্চে মোহাম্মদ শাহ উপস্থিত, নাদির খুন হচ্ছেন এবং তার শরীর এবং চেতনা দুটি ভিন্ন সত্তা হয়ে গেছে, তখন তরমুজকে নাদিরের মুণ্ড হিসাবে ব্যবহার করা ও সেটি নাদির ও মোহাম্মদের কেটে খাওয়ার দৃশ্য এই নাটকের আরও একটি সম্পদ। যাঁরা নাটকটি দেখেননি, তাঁদের কাছে এটি পড়ার পর ঘটনাটি বীভৎস মনে হতে পারে, তবে শিল্পচেতনা কোন স্তরে গেলে এতটা সুন্দর করে মঞ্চে উপস্থাপিত করা যায়, সেটি এই নাটক ও নাট্যনির্মাতা দেখিয়ে দিয়েছেন।

সবশেষে একটি গান ও একটি সংলাপের কথা বলবো। গানটির মূল ভাষা উর্দু। বাংলায় তর্জমা করলে দাঁড়ায় অনেকটা এরকম – “পাথর আমার মাথায় বর্ষিত হচ্ছ কেন,/ একসময় তুমিও তো আমার ঈশ্বর হয়েই থেকেছো/ যবে থেকে তুমি আমায় দিওয়ানা করেই রেখেছো।” নাদিরের বিশ্বাস আর অসহায়তাকে অন্য মাত্রা প্রদান করে এই গান। আর যে সংলাপটির কথা বলছিলাম,

   “– জীবন? আজকাল জীবন কেমন লাগে আপনার মুহম্মদ?
–    ভালোবাসার মতো করুণ।
–    আর মৃত্যু আপনার কেমন লাগছে নাদির?
–    ঘেন্নার মতো উজ্জ্বল।”
–    
উড়ন্ত তারাদের ছায়া সাম্প্রতিক বাংলা থিয়েটারে নতুন অধ্যায়ের সৃষ্টি করেছে।

_____ 
সংস্তব প্রযোজিত ও দেবাশিস নির্দেশিত নাটক উড়ন্ত তারাদের ছায়া-র রিভিউ

Developed by DXDasia