৭৫ পেরিয়ে আজও বাঙালির মুখে মুখে মুখরোচক

পূর্ব ভারতের অন্যতম স্ন্যাকস ব্র্যান্ড মুখরোচক

লদিরাম বা বিকানের ভূজিওয়ালা যতই পসার জমাক না কেন, আজও শহরবাসীর মুখে মুখে ঘোরে- মুখরোচক। ৭৫ বছর ধরে বাংলার ঘরে ঘরে নোনতা স্বাদের ঘরানায় বাংলার নিজস্ব ব্র্যান্ড ‘মুখরোচক’ চানাচুরের (Mukharochak Chanachur) চল শুরু হয়েছিল। ‘এনিটাইম টেস্টি’ থেকে ‘ভালো খান সুস্থ থাকুন’- ট্যাগলাইনের ভিতর দিয়েই নিজেদের পরিচিতি তৈরি করেছে এই ব্র্যান্ড। প্রমাণ করেছে বাঙালিও ব্যবসা করতে পারে, শুধু দেশে নয় বিদেশেও। সম্প্রতি দক্ষিণ ২৪ পরগনার গোবিন্দপুরে নিজেদের কারখানাতেই ৭৫ বছর পূর্তি উপলক্ষে এক অনুষ্ঠানের আয়োজন করে মুখরোচক চানাচুর কোম্পানি। অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন কোম্পানির কর্ণধার প্রণব চন্দ্র সহ বিশিষ্ট ব্যক্তিরা। এই প্রথমবার মুখরোচক চানাচুরের ব্র্যান্ড অ্যাম্বাসাডার হলেন অভিনেত্রী কোয়েল মল্লিক ।

১৯৫০ সালে টালিগঞ্জ ট্রাম ডিপোর সামনে খুবই স্বল্প পরিসরে পথ চলা শুরু করে নির্মলেন্দু চন্দ্র’র এই কোম্পানি। বাঙালি ব্যবসা করতে পারে কিনা দেখিয়ে দিয়েছে এই ব্র্যান্ড।

মুখরোচক-এর ৭৫ বছরে শুভেচ্ছা জানিয়েছেন সংগীতশিল্পী উষা উত্থুপ, মনোময় ভট্টাচার্য, রূপঙ্কর বাগচি, ক্যাকটাস-এর সিধু, অনুপম রায়, ইমন চক্রবর্তী, অভিনেতা অম্বরীশ ভট্টাচার্য, মমতা শংকর প্রমুখ বিশিষ্টরা। টক-ঝাল-মিষ্টি মুচমুচে স্বাদের সঙ্গে কোনো আপোষ করেনি মুখরোচক। অথচ এমন কোনো মশলা এই স্ন্যাক্স কোম্পানি কোনওদিন ব্যবহার করেনি, যার সঙ্গে বাঙালি পরিচিত নয়। যখন একের পর এক মাঝারি আয়তনের বাঙালি প্রতিষ্ঠানে তালা পড়ছে, মুখরোচক চানাচুর, যাঁরা বাংলায় স্ন্যাক্সের ব্যবসার পথিকৃৎ, তাঁরা এখনও মাথা উঁচু করে চার প্রজন্মের ব্যবসা চালিয়ে যাচ্ছেন।

পারিবারিক ব্র্যান্ডের প্ল্যাটিনাম জুবিলি উপলক্ষ্যে মুখরোচক-এর বর্তমান কর্নধার প্রণববাবু বলেন, “গত ৭৫ বছর ধরে প্যাকেটবন্দি স্ন্যাক্স তোইরিতে মুখরোচক নিজের ধারাবাহিকতার প্রমাণ রেখেছে। চানাচুর দিয়ে আমাদের পথ চলা শুরু। এখন আমাদের পদের সংখ্যা আরও বেড়েছে। শিঙাড়া, কচুরি, কড়াইশুঁটির কচুরি-সহ নতুন সব পদেই স্বাদের সেই ধারা বজায় থাকবে।”  

মুখরোচক-এর পথ প্রদর্শক নির্মলেন্দু চন্দ্র

প্রণববাবুর পুত্র প্রতীক চন্দ বলেন, “মুখরোচকের লক্ষ্য স্বাস্থ্যসম্মত ও স্বাদে অনবদ্য প্রোডাক্ট তৈরি করা, আর ভবিষ্যতে মুখরোচকের ব্যাপ্তি যাতে বিশ্ব জোড়া হয় সেই প্রয়াস চালিয়ে যাওয়া।”

আজ মুখরোচক একটি ISO 9001:2008 & 22000:2005 প্রত্যয়িত কোম্পানি। ১৯৫০ সালে টালিগঞ্জ ট্রাম ডিপোর (Tollygunge Tram Depot) সামনে খুবই স্বল্প পরিসরে পথ চলা শুরু করে নির্মলেন্দু চন্দ্র’র এই কোম্পানি। যদিও স্বাদের মহিমায় খুব কমদিনের মধ্যেই বাঙালি পরিবারের প্রিয় সদস্য হয়ে ওঠে মুখরোচক। 

নতুন চিন্তাভাবনা এবং দৃষ্টিভঙ্গিই সম্ভবত ব্র্যান্ডটিকে ডানা মেলতে সাহায্য করেছে। এইভাবে চন্দ্র পরিবারের হাত ধরে সেই সময় বাঙালির নোনতা স্বাদের ঘরানায় মুখরোচক চানাচুর যেন এক চিরন্তন সম্পর্কের গল্প লিখেছিল। মুখরোচকের সুস্বাদু উত্তরাধিকারের দক্ষ মশাল বাহক প্রণব চন্দ্র (Pranab Chandra) যখন নির্মলেন্দু চন্দ্রের (Nirmalendu Chandra) পরে দায়িত্ব গ্রহণ করেন, তখন তিনি বিশ্বব্যাপী মান অনুযায়ী বাজার নিয়ে পরীক্ষা-নিরীক্ষা শুরু করেন। তিনি জানতেন একটি বিশেষ পণ্যকে কীভাবে সুকৌশলে আন্তর্জাতিক ব্র্যান্ডে পরিণত করা যায়। তাই তিনি কিছুদিন পরপরই বাজারের ক্রেতাদের চাহিদার কথা মাথায় রেখে একাধিক নতুন সুস্বাদু পণ্য প্রবর্তন করার কথা ভাবতে থাকেন। তাঁর এই কৌশল সহজেই জনপ্রিয়তা লাভ করে। মুখরোচক ব্র্যান্ডের নামেই একের পর এক নতুন পণ্য বাজারে জায়গা করে নিতে শুরু করে। 

মুখরোচক-এর কারখানা

আধুনিক উৎপাদন পদ্ধতিতে এবং স্বাস্থ্যকর উপায়ে আজ একাধিক জিভে জল আনা খাবার প্রস্তুতিতে মুখরোচক ব্র্যান্ডের জুড়ি মেলা ভার। এমনকি সময়ের সঙ্গে এই কোম্পানির উল্লেখযোগ্য পণ্যগুলির মধ্যে এসেছে নানান বৈচিত্র্য। চানাচুর ছাড়াও মুখরোচক কোম্পানি ভুজিয়া (Bhujia), আলু ভুজিয়া (Alu Bhujia), কাবুলি চানা (Kabuli Chana), মুগডাল ভাজা (Moongdal), মশলা চিড়া ভাজা (Chira Mixture), ডায়েট চিড়া (Diet Chira), মশলা মুড়ি (Masala Muri), চাল ভাজা (Chaal Bhaja ) ইত্যাদি নানা ধরণের পণ্য বিক্রি করে। এছাড়াও যুগের চাহিদার কথা মাথায় রেখে নিমকি (Nimki), নোনতা কাজুবাদাম (Salted Cashew Nuts), নোনতা চিনাবাদাম (Salted Peanuts), ঘি, এলাচ ও চকলেট স্বাদের সোনপাপড়ি (Soanpapri), টিনের প্যাকেটজাত রসগোল্লা (Rosogolla) এবং গুলাব জামুন (Gulab Jamun) প্রভৃতি প্রস্তুত করে মুখরোচক।

টালিগঞ্জের একটি ছোটো দোকান থেকে শুরু করে আজ ছয় একর পরিমাণ জায়গা জুড়ে রয়েছে মুখরোচক কোম্পানির সমগ্র ইউনিট। সম্পূর্ণ ইউনিটটিকে অত্যাধুনিক পদ্ধতিতে রক্ষণাবেক্ষণ করা হয়। প্রতিদিন প্রায় ১০ টন পরিমাণ নানা ধরনের নোনতা খাবার তৈরি হয় এখানে। আশেপাশের ছোটো দোকান থেকে শুরু করে নামী-দামী সুপার মার্কেট, সর্বত্রই মেলে  মুখরোচকের খাবার। সময়ের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বর্তমানে অফলাইনের পাশাপাশি অনলাইন শপিংও চালু করেছে ব্র্যান্ডটি। ফলে ভারতের পাশাপাশি আমেরিকা এবং ইউরোপীয় বাজারেও জায়গা করতে শুরু করেছে বাংলার নিজস্ব ব্যান্ড ‘মুখরোচক’।

বর্তমান কর্নধার প্রণব চন্দ্র

যখন কোনো কোম্পানি কোনো অবস্থাতেই তার দ্রব্যের গুণমান নিয়ে আপোষ করে না, তখন সহজেই কোম্পানিটির একটি বিশ্বস্ত গ্রাহক সংখ্যা তৈরি হয়। বাঙালির ঘরে ঘরে মুখরোচক কোম্পানিটির এতদিন যাবৎ স্বমহিমায় টিকে থাকার পিছনে রয়েছে সেই স্বাদের সঙ্গে আপোষ না করার গল্পই। প্রথমে দেশের বিভিন্ন জায়গা থেকে খাঁটি ডাল, চিড়ে, বাদাম ইত্যাদি সংগ্রহ করা হয়। এরপর কোম্পানির নিজস্ব পরীক্ষাগারে কাঁচা অবস্থায় তার গুণমান সঠিকভাবে পরীক্ষা করা হয়। ‘মুখরোচক’ পরিবার দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করে যে সমস্ত উপাদানের গুণমান সম্পর্কে সঠিক সিদ্ধান্ত নেওয়ার জন্য মানুষের জিভের স্বাদই শেষ কথা বলতে পারে। আমাদের জিভে রয়েছে উন্নত মানের বায়ো-মেকানিজম, যা স্বাদের ধরন নির্ধারণে সহায়তা করে। তাই কোম্পানির যেকোনো উপাদানের সঠিক মান নির্ধারণের জন্য মুখরোচক কোম্পানি অত্যন্ত দক্ষ শেফদের একটি দলকে নিযুক্ত করেছে, যাঁদের পুঙ্খানুপুঙ্খ বিচারের পর তবেই দ্রব্যটি প্যাকেটজাত করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। শুধু তাই নয় উন্নত অটোমেশন প্রক্রিয়ায় বারংবার পরীক্ষা করা হয়। এই অটোমেশন সিস্টেমের মাধ্যমে, পুরো প্ল্যান্টটি পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা সুষ্ঠুভাবে বজায় রাখা হয়, যাকে সহজেই যে কোনও বৈশ্বিক মানদণ্ডের সাথে তুলনা করা যায়। কোনো ব্যবসার শুরু থেকে শেষ শব্দ পর্যন্ত গুণমানই যে একমাত্র মানদণ্ড, সেকথাই যেন বারবার প্রমাণ করে দেয় ‘মুখরোচক’। বাঙালির নিজস্ব ঐতিহ্যে আজও এতো বছর ধরে তাই সহজেই নিজের জায়গা ধরে রাখতে পেরেছে আমাদের ছেলেবেলা থেকে আজকের অত পরিচিত ব্র্যান্ডটি।
 

Developed by DXDasia