
উদ্যোগে বিশ্বভারতীর পল্লিশিক্ষা ভবনের উদ্ভিদ রোগ-বিজ্ঞান বিভাগ
লালমাটির দেশ, বীরভূম মানেই রবি ঠাকুরের কর্মভূমি, তারাশঙ্করের জন্মভূমি, কোপাই নদী, সোনাঝুরির হাট, শান্তিনিকেতন, তারাপীঠ, কঙ্কালীতলা কিন্তু এবার সেই তালিকায় আরও এক অভিনব সংযোজন হতে চলছে। সম্প্রতি চা চাষ আরম্ভ হয়েছে বীরভূমের শ্রীনিকেতনে। উদ্যোগ নিয়েছে বিশ্বভারতীর পল্লিশিক্ষা ভবনের উদ্ভিদ রোগ-বিজ্ঞান বিভাগ।
চা চাষ নিয়ে পড়ুয়াদের মধ্যে উত্তেজনা, ভালোলাগা রয়েছে। এই পরীক্ষামূলক উদ্যোগ সফল হলে এখানেই চা গাছ, চা গাছের বিভিন্ন রোগ, পোকা লেগে যাওয়া ইত্যাদি নিয়ে গবেষণা করা যাবে।
কথা হচ্ছিল উদ্ভিদ রোগ-বিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক ভোলানাথ মণ্ডলের সঙ্গে। তিনি এই অভিনব কর্মযজ্ঞের অন্যতম কাণ্ডারি। লালমাটিতে চা চাষের ভাবনা কীভাবে এল? অধ্যাপক মণ্ডল বঙ্গদর্শন.কম-কে জানিয়েছেন, “বিশ্ববিদ্যালয়ের এগ্রিকালচার ফার্মের বেশ কিছু জায়গা পতিত জমি হিসাবে পড়ে রয়েছে। পুকুরের পাশে বেশ কিছু জায়গা, সেখানে বড়ো বড়ো গাছ আর আগাছা ছিল। এই জায়গাগুলোকে কাজে লাগানোর কথা ভাবলাম। জায়গাটা ঢালু, একদিকে চাষ জমি অন্যদিকে পুকুর। ঢালু জায়গা চা চাষের জন্য উপযুক্ত। কিন্তু এখানে আবহাওয়া অন্য রকম। ভেবে দেখলাম, এর আগে বিধানচন্দ্র কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় গয়েশপুরে চা চাষ করেছে। খড়গপুর আইআইটিতেও চা চাষ হয়েছিল। এখন রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে তেমনভাবে আর নেই কিন্তু চা বাগানগুলো হয়েছিল। সেই ভাবনা থেকেই, পতিত জায়গাগুলোকে এভাবে ব্যবহার করার কথা মাথায় এলো।”
অধ্যাপক মণ্ডলের সঙ্গে কথা বলে জানলাম, এই উদ্যোগে সাহায্য করছে শিলিগুড়ি টেরাই এডুকেশনাল সোসাইটি। এই সংস্থাই চায়ের চারা দিয়েছে। প্রায় এক মাস হল চা গাছগুলো রোপণ করা হয়েছে। নতুন পাতাও বেরিয়েছে। চার প্রজাতির চা গাছ লাগানো হয়েছে, সেগুলো হল টিনালি, টিবি নাইন, ২৩-২৪, ২৫-২৬।

পরীক্ষামূলকভাবে শুরু হওয়া এই চা চাষে সাফল্য এলে যুগান্তকারী ঘটনা ঘটবে। ‘অ্যাগ্রো টুরিজম’ আয়ের সংস্থান করবে। চা-কে কেন্দ্র করে গবেষণাক্ষেত্রেও নবদিগন্ত উন্মোচিত হবে।
লালমাটিতে চা চাষ করতে কোন কোন ‘চ্যালেঞ্জে’র মুখে পড়তে হচ্ছে, অধ্যাপক মন্ডলের মতে: “সবচেয়ে বড়ো চ্যালেঞ্জ চা গাছগুলোকে বাঁচিয়ে রাখা। যে পতিত জমিতে চা চাষ হচ্ছে সেটা কাঁকুড়ে মাটি। বাংলায় চা চাষ হয় দার্জিলিং আর জলপাইগুড়ি-কোচবিহার অঞ্চলে। ওখানকার মাটিতে জৈব সারের পরিমাণ অনেক বেশি, আমাদের লাল কাঁকুড়ে মাটিতে খুব কম। আলাদা করে তা যোগ করতে হবে। মাটি একটি চ্যালেঞ্জ। দ্বিতীয় হচ্ছে তাপমাত্রা। এখানে আবহাওয়া চরমভাবাপন্ন। শীতে খুব ঠান্ডা, গ্রীষ্মে তীব্র গরম। গরমে লু-র মতো পরিস্থিতিতে সমস্যা হয়। বাতাসে জলীয় বাষ্পের পরিমাণ কমে যায়। যে অঞ্চলে চা চাষ হয়, তার তুলনায় আমাদের এখানে বৃষ্টিপাত কম হয়। আমরা জলসেচের নানান ব্যবস্থা করে গাছাগুলোকে বাঁচিয়ে রাখার চেষ্টা করবো।”
অধ্যাপক মণ্ডল আরও জানাচ্ছিলেন, চা চাষ নিয়ে পড়ুয়াদের মধ্যে উত্তেজনা, ভালোলাগা রয়েছে। এই পরীক্ষামূলক উদ্যোগ সফল হলে এখানেই চা গাছ, চা গাছের বিভিন্ন রোগ, পোকা লেগে যাওয়া ইত্যাদি নিয়ে গবেষণা করা যাবে। কৃষক এবং আশপাশের সাধারণ মানুষদের মধ্যে চা চাষ ঘিরে খুশির আবহ। আগামীর পরিকল্পনা নিয়ে তিনি বলছিলেন, “এটা একটা ‘অ্যাগ্রো টুরিজম’ হয়ে উঠতে পারে। উত্তরবঙ্গে বিভিন্ন চা বাগানগুলোতে ছোটো ছোটো কটেজ করে পর্যটনের উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। তেমনই করা যায়। যে এলাকাগুলো পতিত জমি হয়ে পড়ে রয়েছে, সেখানে এমন চা বাগিচা তৈরি করা যাবে। পাশাপাশি গবেষণা তো করাই যাবে।”
বলার অপেক্ষা রাখে না, পরীক্ষামূলকভাবে শুরু হওয়া এই চা চাষে সাফল্য এলে যুগান্তকারী ঘটনা ঘটবে। অ্যাগ্রো টুরিজম আয়ের সংস্থান করবে। চা-কে কেন্দ্র করে গবেষণাক্ষেত্রেও নবদিগন্ত উন্মোচিত হবে। সর্বপরি বীরভূমের পর্যটন মানচিত্রে নতুন পালক যোগ হবে।
