কলকাতার পথে-ঘাটে বাংলার শিকড় খুঁজত মার্কিন মুলুকের ‘বাঙালি’ ইভান

বাংলা ভাষা, প্রকৃতিকে ভালোবেসে এই শহরে এসেছিল ইভান

ঐ যে গড়িয়াহাটের ট্রামলাইন পেরিয়ে একটি ফুটফুটে ছেলে হেঁটে যাচ্ছে, ওর নাম ইভান। কাঁধে শান্তিনিকেতনী ব্যাগ আর চোখজোড়া স্বপ্ন৷ যদিও ওর বাড়ি মার্কিন দেশে, তবু এই কলকাতার আবহে বেশ মানিয়ে গেছে ওকে৷ আর আশ্চর্যের কথা কী জানেন? ইভানের এখানে আসার কারণ বাংলা ভাষা৷ হ্যাঁ ঠিকই শুনলেন, বাংলা। আমরা যখন উজ্জ্বল কেরিয়ার আর আভিজাত্য পালনে ইংরেজি মাধ্যমের দিকে ঝুঁকেছি, তখন এই ছেলেটি উড়ে এল সুদূর মার্কিন মুলুক থেকে৷ বাংলা শিখবে বলে!

বাংলায় বিদেশি পণ্ডিতদের আনাগোনা তো কম ঘটেনি, বাংলার ভাষা-সংস্কৃতি নিয়ে তাঁদের অবদানও যে অস্বীকার করা যাবে এমন নয়। এই যেমন ধরুন শ্রীরামপুর মিশনারী ত্রয়ী। অথবা ম্যাক্সমুলার সাহেব, যাঁর ভারতবিদ্যা সংক্রান্ত গবেষণা যেভাবে বাংলার পণ্ডিতদের পথ দেখিয়েছে তার তুলনা নেই। কিন্তু ইভান তো তেমন কোনো গবেষণার আশায় কলকাতা ফেরেনি৷ ফেরেনি বললাম একারণে, এটা ওর দ্বিতীয় সফর৷ প্রথমবার ওর কলকাতায় আসা ২০১৮’র বর্ষায়, আমেরিকান ইনস্টিটিউট অফ ইন্ডিয়ান স্টাডিজ-এর কলকাতা শাখায়, বাংলা ভাষার ছাত্র হিসেবে। সকাল ন’টা থেকে দুটোর ক্লাসের পর ওর বেশিরভাগ সময় কাটত কলকাতা ভ্রমণে৷ কলকাতার পথঘাট অলিগলি। হয়তো কোনো সঙ্গী নেই, ইভান একাই গুগল ম্যাপ খুলে বেরিয়ে পড়েছে কোনো পার্কের খোঁজে, অথবা কলকাতার কোনো ঐতিহ্যময় স্থান। আর যেতে যেতে ইভান অনুভব করেছে কলকাতার স্পন্দন, তার পথঘাটের ভাষা, মানুষের আলাপচারিতার ভাষা, আনন্দের ভাষা, বিষাদের ভাষা, সান্ত্বনার ভাষা। বাংলা ভাষাকে ইভান আবিষ্কার করেছে কলকাতার জনজীবনে, যার স্রোত প্রতিনিয়ত ইভানকে নতুন নতুন পাঠ দেয়।

‘ভাষাবন্ধু’র সঙ্গে ইভান

ও হো! আমার পরিচয়ই তো দেওয়া হয়নি। আমি কর্মসূত্রে ইভানের ভাষাবন্ধু। আমাদের বন্ধুত্বের মধ্যে বাংলা ভাষা যেন এক সেতুর মতো জুড়ে রয়েছে৷ আমরা সেই সেতুর দুটো প্রান্তই স্পষ্ট দেখতে পাই। ইভান যখন বিশেষ্য, বিশেষণ, সর্বনাম, অব্যয়ের পোশাকি পাঠ ছেড়ে নেমে আসে সহজ আলাপচারিতায়, তখনই যেন একটা ছোট্ট শহর ভাষা পেয়ে যায় ওর চোখেমুখে। সমস্ত বর্ণমালা ঝরে পড়ে ওর কথায়। আমাকে দেখলেই প্রশ্ন করে, “নমস্কার, কেমন আছ?”।  হাই-হ্যালোর সম্ভাষণে আমরা অভ্যস্ত। কিন্তু ইভান জানে কোনো সংস্কৃতির নিজস্ব চেতনা কতদূর ব্যাপ্ত, তার প্রতিদিনের কুশলবিনিময় থেকে বিতর্কের ভাষাও কতটা মিশে থাকে চিন্তনে। মস্তিষ্ক দিয়ে নয়, ইভান হয়তো হৃদয় দিয়ে চিনতে চেয়েছে এই ভাষাকে। 

খুব ভালো গান জানে ইভান। বাংলা গান বলতে রবীন্দ্রসংগীতই খুব বেশি করে শোনে ও। মানে সবটা বুঝতে পারে না, ঘোরের মতো শুনে চলে৷ তারপর গুনগুন করে সুরটা রপ্ত করে নেয়৷ গতবছর ইভান বিশ্বভারতী ঘুরে এসেছে। খোয়াই-এর পথ থেকে কুড়িয়ে এনেছে প্রকৃতিকেও। ঐ সোনাঝুরি, কোপাই-এর জল, এসব তো এখন ইভানেরও। সমস্ত উত্তরাধিকার জন্মসূত্রে মেলে না, তাকে অর্জন করে নিতে হয়। ইভানও সংস্কৃতির পথ ধরে অর্জন করেছে রবীন্দ্রনাথকে। 

ইভান যখন কলকাতায় এসে পৌঁছেছে, তখন ক্যালেন্ডার অনুযায়ী বর্ষাকাল। অথচ এখানে বর্ষার নামগন্ধ নেই। অবাক হয়েছে ইভান। তবে কি আবহাওয়া পরিবর্তনের চক্রে কলকাতা থেকে হারিয়ে গেল বর্ষা? অথচ, কলকাতার ব্যস্ত পথঘাট আর ঘিঞ্জি ঘরবাড়ির মাঝে মাঝে টুকরো টুকরো সবুজ দেখে খুশি হয়েছিল ইভান। ওর আগ্রহের বিষয় এই আবহাওয়ার পরিবর্তন, যা নানা শিল্পমাধ্যমকে প্রভাবিত করছে। ঠিক কীভাবে সচেতন হচ্ছে গ্রাম থেকে নগর? কেমন করে গাছ বাঁচানোর স্লোগান উঠে আসছে টি-শার্ট থেকে পোস্টার সর্বত্র? কেমন করে পালাগানে বৃক্ষরোপণ নিয়ে গান বাঁধছেন বাংলার লোকশিল্পীরা? পটচিত্রে কেমন করে ফুটে উঠছে বৃক্ষসপ্তাহ পালনের ছবি? ভাষা গণ্ডি ছাড়িয়ে ইভানের গন্তব্য বাংলার সংস্কৃতির দিকে।

ইভানের জন্য

ইভান বলেছিল, ও এবার দেশে ফিরে গিয়ে একটা সরকারি প্রকল্পে কাজ করতে চায়। প্রকল্পটি বেশ অভিনব। আমেরিকার সরকার থেকেই প্রশাসন বিভাগের গাফিলতিগুলো চিহ্নিত করতে এই প্রকল্প আয়োজন করা হয়। সেখানে ইভানের কাজ হবে প্রশাসনের দুর্নীতিগুলো প্রমাণসমেত লিপিবদ্ধ করা। এজন্য, কেস স্টাডিও করতে হবে বেশ অনেকখানি৷ তারপর সরকারের কাছে জমা পড়বে সেই তদন্তের রিপোর্ট। আশ্চর্য না! আমাদের দেশে ট্রাফিক পুলিশ বাঁহাতে লক্ষ্মী আনবে, আর সরকার তার যথাযথ মূল্যায়ণ করবে এমনটা ভেবে নেওয়া প্রায় একটা অলীক কল্পনা। কিন্তু ইভানের দেশে এটা স্বাভাবিক। 

ইভানকে নিয়ে একদিন গিয়েছিলাম বিড়লা প্ল্যানেটোরিয়ামে। দুপুরে পরপর দুটি শো, একটি বাংলায়, অন্যটি ইংরেজিতে। ইভান বলল, বাংলায় শো দেখবে। আমি জানতাম, বিড়লা প্ল্যানেটোরিয়ামে যে বাংলা অডিয়োটি চলে তা ইভানের পক্ষে যথেষ্ট কঠিন। ওকে বললামও সে’কথা। কিন্তু ইভানের জেদ ও বাংলাতেই শো দেখবে৷ ফেরার পথে মহাকাশ সংক্রান্ত বিভিন্ন ইংরেজি টার্মের বাংলা পরিভাষা ও নোট করে নিল ওর খাতায়। কিন্তু শুধু কি অনুবাদ দিয়ে শেখা যায় কোনো ভাষার সাহিত্যের মর্ম! যে মহাজাগতিক সংঘর্ষের তথ্যচিত্র আমরা দেখছিলাম, তার প্রতি শব্দ ধরে নয়, তার ভাব দিয়েই বাংলা ভাষাকে চোখ বুজে উপলব্ধি করছিল ইভান। সমস্ত অনুভূতির তো অনুবাদ হয় না।

বাসায় ফিরে আমাকে বাংলাতেই হোয়াটসঅ্যাপ করত ইভান। বাংলা হরফেই। সেখানে বুনে দিত নতুন শেখা শব্দদেরও। বাংলা ভাষা ওর কাছে আরো আপন হয়ে ধরা দিত রোজ।

খাতায় কলমে ওর সঙ্গে দেখা হওয়ার তারিখ ফুরিয়ে এল। ইভান বলল- “কলকাতা ছেড়ে চলে যাব, তাই খুব মন খারাপ, সিডিউল দেখতে ইচ্ছে করছে না”। প্রতিদিনের বাঁধা সময়, ঐ লোহার গেট, খাতায় সই করা, এসব পর্ব সেখানেই শেষ। তাই আমাদের দুজনেরই হয়তো কোথাও নিয়মমাফিক ঘুরতে যাওয়ার ইচ্ছে ছিল না। ইভান আমেরিকাতেও ট্রাম দেখেছে, কলকাতাতেও, কিন্তু চড়েনি কখনো। এই ধীরগতির গাড়িটা মানুষকে নিয়ে ঠিক কবে রওনা দেয়, আর মন্থর গতিতে কোথায় নিয়ে যায়, তা আমিও জানি না। ট্রামের প্রচণ্ড শব্দে এদিন আমরা একে অপরের কথা শুনতে পাচ্ছিলাম না। শুধু বুঝতে পারছিলাম, ভূগোল আবার তার ধর্ম পালন করবে। আবার অনেকগুলো স্থলভাগের মাঝে দেখা যাবে মোটা দাগের নীল রং। ইভান তখন সাত-সমুদ্র তেরো নদী পারে ওর ছোট্ট খরখোশটার মাথায় হাত বুলিয়ে দিচ্ছে…

Developed by DXDasia