কলকাতার সবথেকে বড়ো ক্যাথিড্রালের গল্প

এশিয়ার সবথেকে পুরোনো এপিস্কোপাল গির্জা এটিই

আমাদের মহানগর কলকাতা সব ধর্মের মিলনস্থল। যে কোনো ধর্মের উৎসবেই আনন্দে মাতে কলকাতাবাসী। অবশ্য, ধর্মীয় উৎসবগুলি কখনই কোনো নির্দিষ্ট সম্প্রদায়ের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না, অন্তত, আমাদের দেশে ধর্মীয় উৎসবগুলি চিরকালই হয়ে এসেছে সর্বধর্ম-সমন্বয়ের প্রাণবন্ত উদযাপন। তিলোত্তমা কলকাতাও তার ব্যতিক্রম নয়। এখানে, দুর্গাপুজো, ইদ, ক্রিসমাসে সব ধর্মের মানুষই খুশিতে মাতোয়ারা হয়ে ওঠেন।

ক্রিসমাসে কলকাতা তাক লাগিয়ে দেয় বিশ্বে সেরা শহরগুলিকে। গরমের দেশে শীতের মজা একটু বেশিই। তাছাড়া, এই শহরের ইতিহাসে গুরুত্বপূর্ণ স্থান দখল করে আছে খ্রিস্টধর্ম। কলকাতায় যখন ইউরোপীয়া বসবাস শুরু করেন, তখন থেকেই এখানে ক্রিসমাস পালন শুরু হয়। গড়ে ওঠে একের পর এক চার্চ। কলকাতার ক্যাথিড্রাল বললেই অবশ্য সেন্ট পলস ক্যাথিড্রালের কথাই সবার আগে মনে পড়ে। কলকাতার সবথেকে বড়ো ক্যাথিড্রাল এবং এশিয়ার সবথেকে পুরোনো এপিস্কোপাল গির্জা এটিই। এটি ব্রিটেনের বাইরে ইংরেজ সাম্রাজ্যের প্রথম ক্যাথিড্রালও বটে।

আগে কলকাতার ব্রিটিশদের প্রধান উপাসনালয় ছিল সেন্ট জনস গির্জা। ১৮৪৭ সাল পর্যন্ত এটি কলকাতার অ্যাংলিক্যান ক্যাথিড্রাল ছিল। তারপর সেই মর্যাদা পায় সেন্ট পলস গির্জা। কলকাতায় ইউরোপীয়দের সংখ্যা বাড়তে থাকলে সেন্ট জনস গির্জায় স্থান সংকুলানের সমস্যা দেখা দেয়। ১৮১৯ সালে ভারতের গভর্নর জেনারেল মার্কুইস অফ হেস্টিংসের সময়ে নতুন ক্যাথিড্রাল তৈরির পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছিল। ক্যাথিড্রালটি কোথায় অবস্থান করবে, তা ঠিক করেন বিশপ মিডলটন। তবে নির্মাণকার্য শুরু হওয়ার আগেই মারা যান তিনি। পরের তিন বিশপও নতুন ক্যাথিড্রালের কাজ শুরু হওয়ার আগেই শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। শেষ পর্যন্ত ১৮৩২ সালে বিশপ ড্যানিয়েল উইলসনের উদ্যোগে ক্যাথিড্রাল নির্মাণের প্রকল্প ফের গ্রহণ করা হয়। সেন্ট পলস গির্জার নকশা করেছিলেন সামরিক ইঞ্জিনিয়ার মেজর উইলিয়াম ফোরবস। সিকে রবিনসন গির্জার টাওয়ার ও চূড়ার নকশা করতে ফোরবসকে সাহায্য করেছিলেন।

১৮৩৯ সালে এই গির্জার ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপিত হয়, এবং ১৮৪৭ সালের ৮ অক্টোবর জনসাধারণের জন্য খুলে দেওয়া হয় গির্জাটি। সেই উৎসর্গ অনুষ্ঠান উপলক্ষ্যে রুপোর গিলটি করা ধাতব মানপত্র পাঠিয়েছিলেন সম্রাজ্ঞী ভিক্টোরিয়া। গির্জার উদ্বোধক বিশপ উইলসন এখন অন্তিম নিদ্রায় শায়িত আছেন গির্জারই ভূগর্ভস্থ কক্ষে। একাধিকবার ভূমিকম্পে এই চার্চ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, গির্জার কিছু কিছু অংশ পুনর্নির্মাণ করা হয়েছে তখন। সেন্ট পলস ক্যাথিড্রালের শান্ত সমাহিত পরিবেশ সব ধর্মের মানুষকেই আকর্ষণ করে। এই গির্জার অসাধারণ স্থাপত্য, ভাস্কর্য এবং অলংকরণ দেখতেও ভিড় করেন প্রচুর মানুষ।

বড়োদিনের আগে গত শনিবার সন্ধেয় এক বিশেষ সঙ্গীতানুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়েছিল এই গির্জায়। আব্রাহাম মজুমদার অ্যাকাডেমি অফ মিউজিক ছিল অনুষ্ঠানের পরিচালনায়। সেখানে হাজার হাজার মানুষের সামনে খুদে পড়ুয়ারা ‘বন্দেমাতরম্’ গেয়ে শোনায়। সমবেত দৃঢ় এবং শান্ত কণ্ঠস্বর মন ছুঁয়ে গেছে সবার। সেই ভিডিও সোশ্যাল মিডিয়ায় ভাইরাল হয়েছে। কলকাতার বৃহত্তম গির্জার এই উদ্যোগকে কুর্নিশ জানিয়েছেন দেশের নানা প্রান্তের সম্প্রীতিপ্রেমী মানুষেরা। 

Post Tags
Developed by DXDasia