
এই ঘটনার প্রতিক্রিয়াতেই রবীন্দ্রনাথ ‘সিন্ধুতরঙ্গ’ কবিতা লিখেছিলেন
১৮৮৭ সালের মৃত্যুর ঘটনা। জাহাজডুবিতে মৃত্যু। তা সে ঘটনাকে দেবতার গ্রাস বললে ক্ষতি কিছু নেই তেমন। ‘দেবতার গ্রাস’-এ রাখালের মৃত্যু হয়েছিল, কতিপয় লোকের জোরাজুরিতে। আর এই ঘটনায় প্রায় হাজার লোকের মৃত্যু হয়েছিল কোম্পানির খামখেয়ালে ও মুনাফা লোটার দুর্দম স্পৃহায়। তাতে আরো একটি মিলও ছিল অবশ্য। এই হাজার জনও ছিলেন পুণ্যলোভাতুর। পুরীধামে যাচ্ছিলেন রথযাত্রা উপলক্ষে। তাতেই সলিলসমাধি।
নদ-নদীর দেশ এই বাংলা। জাহাজডুবি, নৌকাডুবি এদেশের নৈমিত্তিক ঘটনা। জল এদেশের আশীর্বাদ ঠিকই। অভিশাপও কিন্তু সে খুব কম দেয়নি। তবে ১৮৮৭ সালের সেই ঘটনাটি জলজ অভিশাপ ছিল না। কলকাতা থেকে পুরী যাওয়ার রেলপথ তখনো তৈরি হয়নি। সমুদ্র ঘুরে বালেশ্বর হয়ে কটক পৌঁছতে হত। তারপর নানান যানবাহনে পুরী৷ সমুদ্রপথে যাত্রী পৌঁছানোর জন্য অনেক সাহেবি কোম্পানিই জাহাজের ব্যবসা খুলেছিল। তারমধ্যে অন্যতম ছিল ক্লাইভঘাট স্ট্রিটের ম্যাকলিন অ্যান্ড কোম্পানি। সে বছর মে মাসে, ইংলিশম্যান পত্রিকায় ম্যাকলিন অ্যান্ড কোম্পানির বিজ্ঞাপন প্রকাশ পায় যে, তাদের জাহাজ ‘স্যার জন লরেন্স’ ২৫ মে রওনা দেবে বালেশ্বরের চাঁদবালী অভিমুখে, আবার ২৭ মে নাগাদ কলকাতা ফিরবে। সামনেই রথ। অসংখ্য যাত্রী তাই এই সুযোগে জাহাজের টিকিট কাটে পুরী যাওয়ার উদ্দেশ্যে।
২৫ মে, ১৮৮৭। ইংলিশম্যান কাগজসহ অন্যান্য কাগজেও আবহাওয়ার পূর্বাভাস হিসেবে জানানো হয়, বঙ্গোপসাগরে জন্ম নিয়েছে একটি ভয়ঙ্কর ঘূর্ণাবর্ত। মারাত্মক এক সাইক্লোন আছড়ে পড়তে চলেছে মেদিনীপুর ও কটকের মাঝামাঝি। সাবধান করা হয়, সেসব অঞ্চলের মানুষকে।
খবর তো বেরোল। কিন্তু ম্যাকলিন এন্ড কোম্পানির তাতে থোরাই কেয়ার। দিব্যি দে ছেড়ে দিল যাত্রীবোঝাই ‘স্যার জন লরেন্স’ জাহাজ, কয়লাঘাট জেটি থেকে। ২৭ মের সমস্ত কাগজেই বেরোতে থাকল ভয়াবহ সব দুঃসংবাদ। মারাত্মক ক্ষয়ক্ষতি দেশজুড়ে। প্রবল জলোচ্ছ্বাস কলকাতাতেও আছড়ে পড়ল। স্ট্র্যা ন্ডরোড তো ভাসমান বটেই, এমনকি হেয়ারস্ট্রিটও জলে ডোবে ডোবে অবস্থা।
সঙ্গে আরেকটি খবরও রইল। স্যার জন লরেন্স ও আরেকটি মালবোঝাই জাহাজ সম্পূর্ণ বেপাত্তা।
ম্যাকলিন কোম্পানি থেকে জানানো হয়েছিল যাত্রীসংখ্যা ৭৫০-এর মধ্যে। কিন্তু এতজন যাত্রীর কী হল, তা নিয়ে তাদের তেমন হেলদোল ছিল না। বরং ইংলিশম্যান পত্রিকার লেখালিখিতে তারা অতিষ্ঠ হয়ে জানায়, জাহাজের নাবিক ক্যাপ্টেন আরভিং অত্যন্ত দক্ষ। এর আগেও ঢের ঝড়ের মোকাবিলা সে করেছে, আর অবশ্যই সফল হয়েছে। ফলে দুশ্চিন্তার কোনো কারণই নেই। ফলে তারা পরবর্তী বিজ্ঞাপনও ছাপিয়ে ফেলে। এতটাই গভীর আত্মবিশ্বাস তাদের।
এমন সময়ই চাঁদবালীর অফিস থেকে জানানো হয়, স্যার জন লরেন্স ২৭ অবধি সেখানে পৌঁছায়নি। ২ জুন জানা গেল, রিসলিউট নামে একটি জাহাজ কলকাতা আসার পথে বহু মৃতদেহ গঙ্গার মোহানায় ভেসে যেতে দেখেছে। সেখানে অধিকাংশ নারী। কোনো কোনো নারীর কণ্ঠলগ্ন শিশুর মৃতদেহ । কারো হাত তো কারো পা অদৃশ্য। জাহাজের ক্যাপ্টেনের লাশটিকে চিহ্নিত করা সম্ভব হয়েছে। তবে সেটিও অক্ষত নয়। সাগরদ্বীপের চড়ায় ক্রমশ মৃতদেহ এসে জমা হচ্ছে। ইংলিশম্যান পত্রিকা এই বিস্তৃত খবর প্রকাশ করে জানায়, স্যার জন লরেন্সের পরিণতি সম্পর্কে আর কোনো সন্দেহ তাহলে রইল না।
এইবার বাঙালি সমাজে জাহাজ কোম্পানির এই ভয়ংকর উদাসীনতা, নিষ্ঠুরতা তোলপাড় ফেলে দেয়। আবহাওয়ার পূর্বাভাস জানা সত্ত্বেও জাহাজ তারা কেন ছাড়ল – তা নিয়ে তারা প্রশ্ন তোলে। আর এত বড়ো ঘটনাটি তারা বেমালুম চেপেই বা গেল কেন? ব্যবসার লোকসানের ভয়ে? যাত্রীদের কোনো খোঁজ নেওয়া, কোনোরকম দুঃখপ্রকাশ – কিচ্ছু কোম্পানি করেনি। জাহাজের যাত্রীরা পরাধীন দেশের নাগরিক বলেই কি এই দুর্ব্যবহার! এইসব প্রশ্ন নিত্যদিন উঠতে থাকে কথায় বার্তায়। খবরের কাগজে। মহামান্য ভাইসরয় একটি শোকবার্তা জানিয়েই ঘটনাটিকে ধামাচাপা দিতে চাইলেও, সত্য একে একে প্রকাশ পেতে থাকে। ‘রহিস অ্যান্ড রায়ত’ জানায়, যাত্রী সংখ্যা ছিল হাজারেরও বেশি। যাত্রীসংখ্যা বাড়ার ফলে টিকিটের দামও প্রচুর বাড়িয়ে দেয় জাহাজটি। যারা পরিবারের লোকজনকে জাহাজে তুলে দিতে এসেছিলেন, তারা কেউ কেউ জানান, ঠাসাঠাসি ভিড়ে যাত্রীদের ঘাড় ঘোরাবারও নাকি জায়গা ছিল না। শোভাবাজারের বনেদি পরিবারের লোকজন যেমন ছিল সেই জাহাজে, তেমনি গাঁ-গঞ্জের বহু মানুষও ছিল। ছিল পুরীর মন্দিরের কিছু কর্মচারী। কলকাতা থেকে তারা ফিরছিল সেখানে।
আরও পড়ুন: দারুণ গরম দিনে কলকাতার পাংখাপুলিং
বে-আইনিভাবে, মুনাফার আশায় এই পরিমাণ লোক জাহাজে তোলার জন্যেই এই ভয়াবহ ক্ষয়ক্ষতি। অথচ কোনো বিচারবিভাগীয় তদন্ত এতে হল না। মেরিন কোর্টে মামলাটি উঠেছিল ঠিকই। তবে তাতে দোষ দেওয়া হয়েছিল প্রকৃতিকে ও জাহাজের মৃত ক্যাপ্টেনকে। আর চাঁদা তোলার ব্যবস্থা হয়েছিল, ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারকে সামান্য সাহায্যের জন্যে৷ যেহেতু দুর্ঘটনার প্রত্যক্ষদর্শী সকলেই মৃত, ফলে কোম্পানির বিরুদ্ধে কোনো অভিযোগই খাড়া করা সম্ভব হয়নি সেদিন। আরো বড়ো কথা, জাহাজযাত্রার বিজ্ঞাপনও কিন্তু বন্ধ ছিল না, একদিনের জন্যেও। যারা মারা গিয়েছিল, তারা অধিকাংশই ভারতীয় কিনা।
এই মারাত্মক ঘটনার প্রতিক্রিয়াতেই রবীন্দ্রনাথ লিখেছিলেন, ‘সিন্ধুতরঙ্গ’ কবিতাটি। শুরুতে লিখেওছিলেন মৃত পুরীযাত্রীদের প্রতি এই কবিতা – প’রী তীর্থযাত্রী তরণীর নিমজ্জন উপলক্ষে’।
অবশ্য, শুধু এদেশের কবি নন। ইংরেজ কিছু মহিলা মিলে বড়োবাজারের জগন্নাথ ঘাট এলাকায় একটি ফলক স্থাপন করেছিলেন। যেখানে লেখা ছিল- “… to the memory of those pilgrims, mostly women, who perished with the ‘Sir John Lawrence’ in the cyclone of 25th May, 1887.”
অতীত ঘটনা ঠিকই। শুধু একটা কূট প্রশ্ন বারবারই উঁকি দিয়ে যায়, ‘সেই ট্রাডিশন সমানে চলছে নাকি?’
ঋণ: কীর্তিবাস কলকাতা – তারাপদ সাঁতরা

