
সুনীতিকুমার চট্টোপাধ্যায় তাঁর স্থাপত্যরীতির নাম দিয়েছিলেন ‘সৌরীন্দ্রিক রীতি’
কল্যাণীয় শ্রীমান সুরেন্দ্রনাথ করকে
আশীর্বাদ
শান্তিনিকেতন
২৫ বৈশাখ ১৩৩৮ শ্রীরবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
১৩৩৮ সনে নিজের জন্মদিনে রবীন্দ্রনাথ ‘রাশিয়ার চিঠি’ উৎসর্গ করছেন যাঁকে, শান্তিনিকেতনের বেশিরভাগ ভবনের স্থাপত্যশৈলীই তাঁর ভাবনার নিদর্শন। আরেকটি বইও রবীন্দ্রনাথ এই ব্যক্তিটিকে উৎসর্গ করেছিলেন। ‘আরোগ্য’। উৎসর্গপত্রে একটি কবিতাও সেই ব্যক্তির জন্য লিখেছিলেন কবি—
বহু লোক এসেছিল জীবনের প্রথম প্রভাতে
কেহ বা খেলার সাথী, কেহ কৌতূহলী,
কেহ কাজে সঙ্গ দিতে, কেহ দিতে বাঁধা।
আজ যারা কাছে আছ এ নিঃস্ব প্রহরে,
পরিশ্রান্ত প্রদোষের অবসন্ন নিস্তেজ আলোয়
তোমরা আপন দীপ আনিয়াছ হাতে,
খেয়া ছাড়িবার আগে তিরের বিদায়-স্পর্শ দিতে।
তোমরা পথিক বন্ধু,
যেমন রাত্রির তারা
অন্ধকারে লুপ্তপথ যাত্রীর শেষের ক্লিষ্ট ক্ষণে।।
উদয়ন
৪ ফেব্রুয়ারি, ১৯৪১
সকাল
কেন করবেন না উৎসর্গ! এই ব্যাক্তিটিই তো যুবকবেলায় কত জায়গায় তাঁর ভ্রমণসঙ্গী হয়েছেন—কত স্মৃতির সঙ্গী। তিনি সুরেন্দ্রনাথ কর।
জোড়াসাঁকোর ‘বিচিত্রা’য় মাঝেমধ্যেই দেখা যেত ছেলেটিকে। অবনীন্দ্রনাথের কাছে আসে, আঁকা শেখে। সেই সময়ে অবন ঠাকুরের এই ছাত্রটির আঁকা বেশ কিছু ছবি তৎকালীন বড়লাট লর্ড কারমাইকেল কিনেছিলেন। মুগা কাপড়ের উপর ব্রাশের লাইনে সামান্য রঙের ছোঁয়ায় আঁকা সাঁওতাল পুরুষ ও তার সঙ্গিনীর ঘরে ফেরার ‘কমরেড’ নামক ছবিটি বিখ্যাত হয়েছিল।

সুরেন্দ্রনাথের আঁকা ছবি ১
রবীন্দ্রনাথ জানতে পারলেন, এই ছেলেটি নন্দলালের আত্মীয়। নন্দলাল তার ‘নতুনদা’। নতুনদার কাছেই তাঁর চিত্রবিদ্যার প্রাথমিক শিক্ষা। ১৮৯২ সালের ৫ মার্চ বিহারের মুঙ্গের জেলার হাবেলি খড়গপুরে জন্মেছিলেন সুরেন্দ্রনাথ। ১১ বছর বয়সে নতুন্দার হাত ধরেই মুঙ্গের থেকে সোজা কলকাতায়। নন্দলাল সুরেন্দ্রনাথকে প্রথম যখন অবনীন্দ্রনাথের সঙ্গে দেখা করান, তখন তাঁর ১৯ বছর বয়স। সেদিন দাদার মতো ছবি-আঁকার জগতে পা রাখার পরামর্শ দিয়েছিলেন অবন ঠাকুর। পরামর্শে কাজ হয়। ছবি আঁকার অনুপ্রেরণা পান তরুণ শিল্পী সুরেন্দ্রনাথ।

সুরেন্দ্রনাথের আঁকা ছবি ২
ছেলেটির গুণ রবীন্দ্রনাথের চোখ এড়িয়ে গেল না। একদিন তাকে দেখতে পেয়ে জিজ্ঞেস করলেন, ‘তুমি পূব বাংলায় এর আগে কোনওদিন গিয়েছ কি?” উত্তর পাওয়ার অপেক্ষা না করে নিজেই আবার বললেন, “আমি যাচ্ছি, কুষ্টিয়া হয়ে শিলাইদহে—সেখানে থাকব কয়েকদিন, তারপর বোটে করে পদ্মায়। তুমিও যেতে পারো আমার সঙ্গে।” এখানেই থেমে থাকেননি কবি। নবীন শিল্পীকে সঙ্গে নেবেন, এই ব্রত নিয়েই যে তিনি মাঠে নেমেছিলেন, বোঝা গেল তাঁর পরবর্তী প্রস্তাবে—“চমৎকার জায়গা শিলাইদহ— খোলা আকাশের নিচে বোটে ভেসে বেড়াব। তোমার ভালো লাগবে।”
এমন প্রস্তাব্ হেলায় হারাতে নেই, এই জ্ঞান ছিল সুরেন্দ্রনাথের। পরদিনই নন্দলালের মত নিয়ে রবীন্দ্রনাথের সঙ্গে বেরিয়ে পড়েন। শিয়ালদহ থেকে ট্রেনে কুষ্টিয়া, সেখান থেকে শিলাইদহ। পদ্মার জলরাশির বিস্তার, প্রকাণ্ড খোলা আকাশ, পদ্মার চরে ঝাউবন, জ্যোৎস্নায় উদ্ভাসিত পদ্মার চর, আকাশ-ছাওয়া বুনো হাঁসের দল -এই নিয়ে কবিসঙ্গ করে স্মরণীয় চার দিন কাটিয়েছিলেন সুরেন্দ্রনাথ। তরুণ শিল্পীটি সম্মোহন কাটিয়ে রঙে-রেখায় প্রকৃতিকে ধরেছিলেন কিনা জানা যায় না তবে, ফিরে যাওয়ার আগে কবির কাছ থেকে আবার একটি প্রস্তাব পেয়েছিলেন—“তুমি শান্তিনিকেতনে এসো। ওখানে এমনি খোলা আকশের নীচে অবারিত মাঠ, খোয়াই, আশেপাশে সব সাঁওতাল আমাদের প্রতিবেশী—তোমার ভালোই লাগবে।”
শান্তিনিকেতনের সঙ্গে সুরেন্দ্রনাথের আত্মীয়তায় সেই শুরু। ১৯১৭ সালের জুলাই মাসে শান্তিনিকেতনে ঢুকলেন তিনি। রবীন্দ্রনাথ শান্তিনিকেতন সম্বন্ধে তাঁকে যেমন যেমন বর্ণনা দিয়েছিলেন, আস্তে আস্তে মিলিয়ে নিতে লাগলেন। আর্থিক সঙ্গতি না থাকায় তখন শান্তিনিকেতনে বেশিরভাগ বাড়িই একান্ত প্রয়োজন ছাড়া তৈরি হত না। সুরেন্দ্রনাথ প্রথমেই তৈরি করেছিলেন ‘শিশুবিভাগ’, পরে নাম হয় ‘সন্তোষালয়’। এর পর তৈরি করলেন লাইব্রেরির উত্তরে বড় কুয়ো ও সংলগ্ন স্নানাগার। ১৯১৯ সালে কলাভবনের শিক্ষক হিসেবে যোগ দিলেন সুরেন্দ্রনাথ।
১৯২৪ সালে ইউরোপ সফরকালে কবি তাঁর এই তরুণ বন্ধুকে সঙ্গে নিয়ে চললেন। ইটালিতে থাকাকালীন মাইকেল এঞ্জেলোর বিখ্যাত কাজ দেখা ছিল তাঁর অনন্য অভিজ্ঞতা। এ ছাড়া ইউরোপে লিথোগ্রাফের কাজ দেখে উৎসাহিত হয়ে দেশে ফিরে তিনি কলাভবনে লিথোগ্রাফ শেখাতে শুরু করে দেন। তিন বছর পর আবার কবির সঙ্গী হয়ে পাড়ি দিলেন ইন্দোনেশিয়াসহ মালয়, জাভা, সুমাত্রায়। সুরেন্দ্রনাথ এই সফর থেকে অনেক কিছু শিখে আসেন। ওখানকার নারী ও পুরুষদের সাজপোশাক, গৃহসজ্জা, মঞ্চসজ্জায় বাটিকের ব্যবহার তাঁকে আকর্ষণ করে। ওখানকার আসবাবপত্র, দীপদান, বিভিন্ন আকৃতির পাত্রের স্কেচ এঁকে নিয়ে এসেছিলেন, পরে উত্তরায়ণের অভ্যন্তরের সজ্জায় সে সব কাজে লাগাতে পেরেছিলেন। এ ছাড়া রবীন্দ্রনাথের বিভিন্ন নাটকে, গীতিনাট্যে, নৃত্যনাট্যের মঞ্চসজ্জাসহ কলাকুশলীদের বেশবিন্যাসেও সেই ডিজ়াইন ব্যবহার করেছিলেন।
শান্তিনিকেতন ও রবীন্দ্রনাথের সঙ্গে কতটা জুড়েছিলেন, ব্যক্তিগত জীবনেও রেখেছিলেন প্রমাণ। রবীন্দ্রনাথের যৌবনের সুহৃদ শ্রীশচন্দ্র মজুমদারের কন্যা, শান্তিনিকেতনের খ্যাতনামা গায়িকা রমা মজুমদার ওরফে নুটুকে প্রেম নিবেদন করেন সুরেন্দ্রনাথ। অবশেষে ১৩৩৮ বঙ্গাব্দের পঁচিশে বৈশাখ কবির জন্মতিথিতে দু’জনে পরিণয়সূত্রে আবদ্ধ হন।

উত্তরায়ণের নকশা
রবীন্দ্রনাথের সঙ্গে দক্ষিণ ভারত ঘুরে এবং নন্দলালের সঙ্গে উত্তর ভারত ঘুরে, দুই প্রদেশের শিল্পরীতির সঙ্গে পরিচিত হওয়ার সুযোগ পেয়েছিলেন। যে শিল্পরীতির ভাবনায় তিনি গড়ে তোলেন শান্তিনিকেতনের স্থাপত্যে সিংহসদন থেকে কলাভবনের নন্দন, তার অদূরেই মাটি ও আলকাতরায় মেশানো বাড়িটিসহ দিনান্তিকা, চিনাভবন, হিন্দীভবন, সংগীতভবন, রতনকুঠি, উত্তরায়ণ চত্বরের উদয়ন, কোণার্ক, শ্যামলী, পুনশ্চ, উদীচী এবং তৎসংলগ্ন বাগান।

উদীচীর নকশা
১৩৪২ বঙ্গাব্দের ২৭ বৈশাখ। শান্তিনিকেতনে কবির ৭৫তম জন্মোৎসব পালনের অনুষ্ঠানের পর একটি শোভাযাত্রা ‘নবনির্ম্মিত কুটীর “শ্যামলী”র দিকে যাত্রা করে। কারণ এবার থেকে নতুন আবাস ‘শ্যামলী’তে রবীন্দ্রনাথ থাকতে শুরু করবেন। গৃহপ্রবেশের আগে বলেছিলেন, ‘পরিকল্পনাকারীগণ ইহাকে একটি সুন্দর কলা শিল্পের নিদর্শনে পরিণত করেছেন।’ একটি কবিতায় এই গৃহের স্থাপত্যশিল্পীর প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশও করেন। কবিতাটির কয়েকটি পঙ্ক্তি, ‘হে সুরেন্দ্র, গুণী তুমি, / তোমারে আদেশ দিল, ধ্যানে তব, মোর মাতৃভূমি—
অপরূপ রূপ দিতে শ্যাম স্নিগ্ধ তাঁর মমতারে / অপূর্ব্ব নৈপুণ্যবলে।’
সুরেন্দ্রনাথের অসংখ্য কীর্তি আজও সারা দেশের মনোহরণ করে। পরের দিকে আঁকা ছেড়ে স্থাপত্যের দিকেই ঝুঁকে ছিলেন। শুধু তো বিশ্বভারতীর স্থাপত্য নয়, দেশের বিভিন্ন স্থাপত্যেও তিনি মুন্সিয়ানার পরিচয় দিয়েছিলেন। উদয়ন বাড়িটি দেখে ধনপতি আম্বালাল সারাভাই আমদাবাদে তাঁর বিরাট প্রাসাদের নকশার দায়িত্ব তাঁকে দিয়ে করিয়েছিলেন। এ ছাড়াও বোকারো তাপ বিদ্যুৎকেন্দ্র গড়া হলে প্রতিষ্ঠানের কর্মীদের বাসস্থানের জন্য টাউনশিপটির নকশাটি সুরেন্দ্রনাথেরই করা। সব কিছু পরেও তিনি ছিলেন নীরব কর্মী। সম্পূর্ণ প্রচারবিমুখ। দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জনের মৃত্যুর পর স্মৃতিসৌধ নির্মাণের কাজটি এমন শর্তে করেছিলেন যে, সেখানে যেন কোনও ভাবেই তাঁর নাম উল্লেখ না করা হয়। মহাজাতি সদনের স্থাপত্যের নকশাতেও সুরেন্দ্রনাথ ছিলেন অদ্বিতীয়।
তথ্যসূত্রঃ
রাশিয়ার চিঠি, আরোগ্য – রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
মেঘমুলুক, শ্যামলী আচার্য
THE POET'S HOME: ARCHITECTURAL INNOVATIONS IN RABINDRANATH TAGORE'S DWELLINGS IN SANTINIKETAN, by Saptarshi Sanyal
আনন্দবাজার পত্রিকা, পীতম সেনগুপ্ত
বাঙালির শিল্প-ইতিহাস, banglaworldwide.com
https://ruchikaliveblog.wordpress.com/2017/11/09/surendranath-kar-santiniketan-birbhum/
