নন্দলাল, রামকিঙ্করের হাতে গড়া ‘কালো বাড়ি’

রবীন্দ্রনাথের প্রাথমিক আপত্তি সত্ত্বেও তৈরি হয়েছিল এই বাড়ি

সদ্য তখন থাকতে শুরু করেছি শান্তিনিকেতনে। হাতের তালুর মতন করে চারপাশটা চিনে ফেলা তখনও ঠিক হয়নি। ভাষাভবন, মিউজিয়াম, হিন্দি ভবনের পাশের ক্যান্টিন, ঘন্টাতলা, সঙ্গীতভবন আর কলাভবন, এইই চিনতাম শুধু। আর আমারই মতন সদ্য এসে পড়া মানুষজনের আক্ষেপ শুনতাম — “এতগুলো  ভালো ভালো বাড়ি এখানে ফেঁদেছিলেন রবীন্দ্রনাথ, কোনও একটাতেও ছাত্রছাত্রীদের থাকার বন্দোবস্ত করেননি!” সত্যিই তো, এ কিন্তু ভারি অন্যায়! এরকম ভেবেই বোলপুরের ভীষণ হতাশ গরমের দিনগুলো কেটে যাচ্ছিল একরকম, আচমকা বাদ সাধল পরিচয়। না, শুধু মানুষজনের সঙ্গে নয়, ক্যাম্পাসের ভিতরকার ঘরবাড়িদের সঙ্গে পরিচয় হওয়ার পর প্রথমদিকে তৈরি অমন প্রচুর ভুল ধারণা আমার ভেঙেছে। আক্ষরিক অর্থেই হাঁ করে জেনেছি তখন এখানকার নানা বাড়ির ইতিহাস। এমনকি অবাক হয়ে জেনেছিলাম, ছাত্রাবাস হিসেবেই ব্যবহৃত একটি বাড়ি নিয়ে আস্ত একখানি বইও বের করেছে বিশ্বভারতী। সামান্য মাটির বাড়ি, অথচ সাদামাটা বাড়ি নয় মোটে। 

কলাভবন আর সঙ্গীতভবনের মাঝখানের কালোবাড়ির কথাই হচ্ছে। উদয়ন, শ্যামলী, দেহলীর মতো শান্তিনিকেতনে রবীন্দ্রনাথের অন্যান্য বাড়ির মতো একটু জমকালো পোশাকি নাম এই বাড়িটি পায়নি। এ শুধুই আটপৌরে নামে খ্যাত- ‘কালো বাড়ি’। একসময় এই বাড়িটিতে কলাভবনের বিভিন্ন বিভাগের ক্লাস হত। এমনকি, মিউজিয়াম হিসেবেও কিছুদিন ব্যবহৃত হয়েছে এই বাড়ি। কলাভবনের ছাত্রদের আবাসস্থলও ছিল কিছুদিন। শোনা যায়, ছাত্রদের মধ্যে নাকি রীতিমতো রেষারেষি চলত, কে বা কারা এই বাড়িটিতে থাকবার সুযোগ পাবেন তা নিয়ে। অবশ্য হবে নাই বা কেন, নন্দলাল বসু ও রামকিঙ্কর বেইজের যৌথ উদ্যোগে একটু একটু করে গড়ে তোলা এই মাটির বাড়ি তাদের কাছে প্রায় তীর্থের মতোই। 

বলা হয়,  ১৯৩৪-এর গরমে কলাভবনের ছাত্রদের সঙ্গে নিয়ে নন্দলাল বসু শুরু করেছিলেন এই বাড়ি। তার কিছুদিন আগেই বৃষ্টির চোটে অন্য এক মাটির বাড়ি শ্যামলী ভেঙে ভেঙে পড়ছে ব’লে কয়েক দিন আগেই বিশ্বভারতী শান্তিনিকেতনে মাটির বাড়ি তৈরিতে নিষেধাজ্ঞা জারি করেছে। প্রবল ঝড়-বৃষ্টিতে মাটির বাড়ি ভেঙে পরার সমূহ সম্ভাবনা শান্তিনিকেতনে। মিছিমিছি এমন বাড়ি তৈরি করে শ্রম ও অর্থ নষ্ট করে লাভ নেই। সুতরাং, স্বয়ং রবীন্দ্রনাথও প্রথমে নন্দলাল বসু ও কলাভবনের ছাত্রদের এই খ্যাপামির খবরে খুব একটা সন্তুষ্ট হননি। পরে অবশ্য বাড়ি দেখে তাঁর সে ভুল ভাঙে। নন্দলালকে নাকি রবীন্দ্রনাথ বলেছিলেন, ‘‘এ আশ্রমের বিশেষ সম্পদ।’’মাটি আর আলকাতরা দিয়ে এই বাড়ি ঠিকঠাক তৈরি হতে সময় লেগেছিল প্রায় সাত বছর। বাড়িতে মোট ঘর ছ’টি। বাড়ির ছাদে প্রথমদিন থেকেই অ্যাসবেসটসের শিট। বাড়ির দেওয়ালে বাংলার লোকচিত্রর সঙ্গে মিশে গেছে অজন্তার ভাস্কর্য, মহাবলিপুরমের শিল্পশৈলী। পাশাপাশি মিশরীয় ভাস্কর্যের মিশেলও ঘটেছে। শুধু নন্দলাল বসু বা কলাভবনের ছাত্ররাই নয়, রামকিঙ্কর বেইজের হাতের ছোঁয়াও রয়েছে এই বাড়ির বাইরের দেওয়ালের কারুকাজে। এমন জনরবও রয়েছে, এই বাড়ি নির্মাণে ভুবনডাঙার সেই সময়ের বিখ্যাত গৌর মিস্ত্রির মুন্সিয়ানাও জড়িয়ে। ঘুরে ঘুরে এর চারপাশ দেখলেই টের পাওয়া সম্ভব– ফুল, পাখি, বাঁদর, তাল আর খেজুর গাছ, নৃত্যরত কন্যা ইত্যাদি বিভিন্ন অনবদ্য কিছু ডিজাইনে কালো বাড়ির বাইরের সমস্ত দেওয়াল সাজিয়ে দিয়েছেন শিল্পী নন্দলাল এবং রামকিঙ্কর। তাতে এক হয়ে গিয়েছে প্রাচ্য ও পাশ্চাত্যের শিল্পসুষমার মিশেল। নির্মাণের দিক থেকে দেখলে ‘চৈত্য’ ও ‘শ্যামলী’ বাড়ির সঙ্গে খানিক মিল দেখতে পাওয়া যায় এই বাড়ির।  

বহুদিন পর্যন্ত এখানে কলাভবনের ছাত্ররাই থেকেছেন। বীরভূমের প্রবল গরমে ভুবনডাঙার এই মাটির বাড়িটি প্রায় মরূদ্যানস্বরূপ তাদের কাছে। এখনও ক্যাম্পাসের ভিতরের ক্লান্ত ভ্রমণার্থী কিংবা কলাভবন বা সঙ্গীতভবনের ছাত্রদের আড্ডায় সরগরম হয়ে থাকে কালো বাড়ির বারান্দা। সন্ধ্যে নামার পর কোনও কোনও দিন শোনা যায় বব ডিলান বা বিটলসের গানও। রাত যত বাড়ে, চারপাশের সমস্ত হোস্টেলের ছাত্রছাত্রীরা এক এক দলে গান বা গল্পের আসরে বসে যায় বাড়ির দালানের ফাঁকফোকরে। সদ্য চলে আসা পথভুলো মানুষজনেরাও সেখানে থাকেন বৈকি। পরিচয় ঘটে তাদেরও, শুধু মানুষজনের সঙ্গে নয়, একটি আটপৌরে বাড়ির সঙ্গে। শান্তিনিকেতনে যার কখনো নামকরণ করাই হয়ে ওঠেনি। তাতে কী, আদরের ডাকনামেই সে দিব্বি আছে। 

সে শুধুই কালোবাড়ি।

 

Developed by DXDasia