
রবীন্দ্রনাথের দর্শনচিন্তা প্রতিফলিত হয়েছে বিশ্বভারতীর সর্বত্র
বিশ্বভারতী তথা শান্তিনিকেতন কেবল শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানই নয়, সেখানে প্রতিফলিত হয়েছে রবীন্দ্রনাথের দর্শনচিন্তা। তবে বিশ্বকবির নাম ব্যবহৃত হয়নি। জওহরলাল নেহরু বিশ্ববিদ্যালয়, লেডি শ্রীরাম কলেজ, লেডি ব্রেবোর্ন কলেজের থেকে পার্থক্য অনেক। ‘বিশ্বভারতী’ নামের মধ্যে ফুটে ওঠে পৃথিবীর নানা ভাবধারা এবং আদর্শের সমন্বয়। রবীন্দ্রনাথ বিশেষ উদ্দেশ্য নিয়েই এমন নাম রেখেছেন।
খোলা প্রকৃতির মাঝে শিশুশিক্ষা
বিশ্বভারতীর নানা বিভাগ যত্ন নিয়ে গড়ে তুলেছেন রবীন্দ্রনাথ নিজে। তাঁর সৃজনশীলতা এবং দূরদর্শিতার ছাপ পড়েছে সর্বত্র। ১৯০১ সালে শান্তিনিকেতনে প্রতিষ্ঠা করেন এক আশ্রম বিদ্যালয়। ব্যস্ত কলকাতার ভিড় এবং ঔপনিবেশিক ক্লেদ থেকে দূরে উদার প্রকৃতির সঙ্গে তিনি একাত্ম হতে চাইছিলেন। শান্তিনিকেতনে নানা ঋতুর মায়া, সবুজের সমারোহে খুঁজে পান মুক্তির আনন্দ। খোলা প্রকৃতির মাঝে শিশুশিক্ষার ভাবনা ইতিমধ্যেই তাঁর মনে দানা বেঁধেছিল। প্রকৃতিই হাতে কলমে বিজ্ঞান আর প্রযুক্তি শেখাবে, নিজে থেকেই সালোকসংশ্লেষ, পতঙ্গবিদ্যা, সংগীত, নৃত্য বুঝিয়ে দেবে – সেরকমই চেয়েছিলেন। এমন স্বপ্ন থেকেই গড়ে ওঠে পাঠভবন।
কবিকে প্রভাবিত করেন শান্তিনিকেতনের বাউলেরা। এঁদের সুফি ঘেঁষা দর্শন তাঁকে কৌতুহলী করেছিল। পাঠভবন ও শিক্ষসত্র ছাড়াও আনন্দ এবং সন্তোষ পাঠশালা গড়ে তোলার পিছনেও ছিল সেই ভাবধারার অবদান। শ্রীনিকেতন থেকে কয়েক কিলোমিটার দূরে পাঠভবনের প্রাক-বিদ্যালয় হিসেবে আনন্দ পাঠশালা আর শিক্ষাসত্রের প্রাক-বিদ্যালয় হিসেবে সন্তোষ পাঠাশালা আজও ছড়িয়ে চলেছে মুক্তচিন্তার আলো।
শতবর্ষ আগে রবীন্দ্রনাথ যা ভেবেছেন, শিক্ষার সেই আদর্শ নিয়ে আজ সারা পৃথিবীতে চর্চা হচ্ছে। একই প্রতিষ্ঠানের ছাতার তলায় বুনিয়াদি শিক্ষা এবং উচ্চতর গবেষণা – এমন ব্যবস্থা সত্যিই যুগান্তকারী। পশ্চিমের কোনো চিন্তাবিদ সেই সময়ে এমন ভাবার সাহসই পাননি।
১৯১৯-এ রবীন্দ্রনাথ প্রতিষ্ঠা করেন সংগীত এবং চারুকলার দু’টি স্কুল। সেগুলি ছিল তাঁর কাছে বেঁচে থাকার মাধ্যম – দর্শন, আধ্যাত্মিকতা, ইতিহাস, ভূগোল, বিজ্ঞান এবং পরিবেশের সমন্বয়। শান্তিনিকেতনের কলাভবন অথবা শ্রীনিকেতনের শিল্প সদনের কথাই ভাবুন – অন্য কোনো আধুনিক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের সঙ্গেই তুলনাই করা চলে না এদের। রবীন্দ্রনাথের নাচ এবং গানে যেন হিন্দুস্তানি ধ্রুপদী এবং পশ্চিমি সঙ্গীতের আশ্চর্য মেলবন্ধন ঘটেছে। মণিপুরি, কথাকলি, ক্যান্ডি প্রভৃতি ধারার নৃত্য মিশে গিয়েছে রাসায়নিক বিক্রিয়ার মতো – উদ্ভব ঘটেছে নতুন যৌগের।
বিশ্বভারতীর নানা বিভাগ যত্ন নিয়ে গড়ে তুলেছেন রবীন্দ্রনাথ নিজে
পরীক্ষানিরীক্ষার অবাধ সুযোগ রয়েছে বিশ্বভারতী বিশ্ববিদ্যালয়ে। যে কৃষি হোক বা গোষ্ঠী শিক্ষা। গ্রাম পুনর্গঠনের উদ্দেশ্যে রবীন্দ্রনাথ শুরু করেছিলেন বৃক্ষরোপণ, হলকর্ষণ, বসন্ত উৎসব। এইসব উৎসবে রয়েছে পরিবেশ সংরক্ষণের বার্তা – যা এখন বড়োই প্রাসঙ্গিক। গ্রামীণ উন্নয়নের জন্য উদ্ভিদবিদ্যা, জৈবপ্রযুক্তির মতো বিজ্ঞানের নানা শাখার প্রয়োগ করেন কৃষিকাজে। উপনিষদ, বেদান্ত হোক বা বৌদ্ধশাস্ত্র – প্রাচীন দর্শনে ছিল রবীন্দ্রনাথের অবাধ বিচরণ। বিশ্বভারতীতে আমরা দেখি চিনা ভবন, জাপান বিদ্যা, নিপ্পন ভবনের মতো নানা সংস্কৃতির সহাবস্থানের উদ্যোগ।
ব্যস্ত কলকাতার ভিড় থেকে দূরে নানান সংস্কৃতির সহাবস্থান
বিশ্বভারতীর প্রত্যেকটি ইটে খুঁজে পাওয়া যায় চিন্তার বহুমাত্রিকতা। যার মধ্যে দূরদৃষ্টি, সংবেদন এবং সৃজনের গভীরতা রয়েছে। চারদিকে বিভেদের পরিবেশে আজও রবীন্দ্রনাথের বার্তা অনুসরণ করে বিশ্বভারতী ডাক দেয় –
“চিত্ত যেথা ভয়শূন্য, উচ্চ যেথা শির,
জ্ঞান যেথা মুক্ত, যেথা গৃহের প্রাচীর
আপন প্রাঙ্গণতলে দিবসশর্বরী
বসুধারে রাখে নাই খণ্ড ক্ষুদ্র করি,…”
(সুশান্ত দত্তগুপ্তের ‘A random walk in Santiniketan Ashram’ এবং শান্তিনিকেতন বিষয়ক আরও নানা বই থেকে অনুপ্রাণিত)

