জন্মশতবর্ষে সমরেশ বসু ডিজিটাল আর্কাইভ

শতবর্ষের আলোয় সমরেশ বসুর জীবন এবং সাহিত্যকর্ম

চিত্রগ্রাহক: নিমাই ঘোষ। সংগ্রহ: উদিত বসু।

তিনি একই সঙ্গে সমরেশ, কালকূট ও ভ্রমর। ভিন্ন ভিন্ন নামের সত্তাকে বিষয়ে, শৈলীতে আলাদা করতে সফল হয়েছিলেন। অথচ তিনি লিখছেন একই কালে। একই উপলক্ষে, বিভিন্ন পত্রিকায় প্রকাশিত হচ্ছে ভিন্ন ভিন্ন নামে লিখিত ভিন্ন স্বাদের লেখা। সমরেশ বসুর চরিত্ররা রক্তমাংসের গন্ধ ছড়িয়ে সংগ্রাম করে বেঁচে থাকা বা বাঁচতে চাওয়া মানুষ। ব্যক্তিগত জীবনে এক সময়ে প্রবল দারিদ্রের সঙ্গে লড়াই করেছেন, আবার সাহিত্যকে পেশা হিসেবে গ্রহণ করে পৌঁছেছেন খ্যাতির শীর্ষে। দেবেশ রায় তাঁর মৃত্যুতে লেখা রচনাটির শিরোনামই দিয়েছিলেন, ‘জীবনের শেষদিন পর্যন্ত তিনি লেখক এবং পেশাদার লেখক’ (প্রতিক্ষণ, ৫ম বর্ষ, ১৭ সংখ্যা, ২–১৬ এপ্রিল ১৯৮৮)। লিখেছিলেন, “তিনি আমাদের মতো অফিস-পালানো ‘কেরানি লেখক’ ছিলেন না, যাঁদের সাহস নেই লেখাকে জীবিকা করার অথচ ষোল আনার ওপর আঠারো আনা শখ আছে লেখক হওয়ার।” সমরেশ বসু্র প্রতি নিরন্তর শ্রদ্ধায়, নিজের লেখক-অবস্থানকে হেয় করার ছলে দেবেশবাবু যা বলেছেন তা অস্বীকার করার উপায় নেই। বরং সমরেশ বসুর জন্মশতবর্ষে তা স্মরণীয়। তাঁর জীবন ও সাহিত্য, প্রাসঙ্গিকতা ও দূরদর্শিতা আগামী প্রজন্মের কাছে পৌঁছে দিতেই শতবর্ষ উপলক্ষে গড়ে উঠেছে সমরেশ বসু ডিজিটাল আর্কাইভ।

বাঙালি সাহিত্যিকদের ওপর প্রাতিষ্ঠানিক আর্কাইভ থাকলেও, এটিই সর্বপ্রথম প্রাইভেট ডিজিটাল আর্কাইভ যা একক ভাবে একজন বাঙালি লেখকের জীবন এবং সাহিত্যকর্ম তুলে ধরবে বলে মনে করা হচ্ছে।

সমরেশ বসু ডিজিটাল আর্কাইভ শুরু করার পরিকল্পনাটি সমরেশের দৌহিত্র প্রাচেতস সমাদ্দারের (কনিষ্ঠ কন্যা মৌসুমি সমাদ্দারের পুত্র) উদ্যোগেই। বাঙালি সাহিত্যিকদের ওপর প্রাতিষ্ঠানিক আর্কাইভ থাকলেও, এটিই সর্বপ্রথম প্রাইভেট ডিজিটাল আর্কাইভ যা একক ভাবে একজন বাঙালি লেখকের জীবন এবং সাহিত্যকর্ম তুলে ধরবে বলে মনে করা হচ্ছে। বিশেষজ্ঞ ও তরুণ গবেষকদের প্রচেষ্টায়, এই আর্কাইভের গবেষণা ও ডিজিটাইজেশনের কাজ চলছে গত এক বছরেরও বেশি সময় ধরে।

 

প্রাচেতস সম্মাদ্দারের কথায়, “এই ভাবনা শুরু হয়েছিল একান্তই ব্যাক্তিগত জায়গা থেকে; পারিবারিক ভাবে আমাদের কাছে দাদুর যে স্মারক বা নথি আছে, তার সংরক্ষণই ছিল উদ্দেশ্য। সেই কাজটা চলতে চলতে এমন আরও কিছু মানুষের সংস্পর্শে আসি, যাঁদের সংগ্রহে ওঁর মূল্যবান স্মারক বা স্মৃতিচিহ্ন রয়েছে, এবং সেগুলো ডিজিটাল সংরক্ষণের জন্য তাঁরা আগ্রহ প্রকাশ করেন। এই ভাবে আর্কাইভটির সংগ্রহ প্রসারিত হয়। এর পাশপাশি আমাদের এটাও মনে হয়, যে সমরেশের এই স্মারকের মধ্যে তাঁর জীবন আর সাহিত্য রচনার যে গল্পগুলো জড়িয়ে আছে, সেটাও সবার সঙ্গে ভাগ করে নেওয়া প্রয়োজন। এবং এভাবেই সমরেশ বসু ডিজিটাল আর্কাইভটির সূচনা হয়।”

বাবার সঙ্গে চার ছেলে মেয়ে। বাঁদিক থেকে দেবকুমার, মৌসুমী (কোলে), নবকুমার এবং বুলবুল। মধ্যমণি সমরেশ বসু। মৌসুমী সমাদ্দারের সংগ্রহ থেকে।

এই আর্কাইভে সমরেশের জীবন এবং সাহিত্যের সঙ্গে জড়িত নানাবিধ স্মারক ও নথি, যথা আলোকচিত্র, চিঠিপত্র এবং পাণ্ডুলিপি, ডিজিটালি সংরক্ষণ করা হয়েছে।

সমরেশ বসু ডিজিটাল আর্কাইভ-এর আর্কাইভিস্ট বা সংরক্ষণাগারবিদ ড: সম্পূর্ণা চক্রবর্তী বলেন, “এই আর্কাইভের তথ্য সংগ্রহের এবং ব্যবহারের প্রক্রিয়াকে সরলীকরণ করে বোঝার চেষ্টা করে একজন লেখক কীভাবে কাজ করেন। সমরেশ বসুর জীবন এবং তাঁর সাহিত্য ভাবনার একটি প্রকৃত রূপ প্রদান করার চেষ্টা করে। নতুন প্রজন্মের পাঠক পাঠিকাদের বাংলা সাহিত্যের সঙ্গে একাধিক মাধ্যমে যুক্ত করার জন্যেই এই ডিজিটাল আর্কাইভটি গড়ে তোলা হয়েছে। সমরেশের স্মারক ও নথি সংগ্রহ ও বৈদ্যুতিন সংরক্ষণের কাজ চালানোর পাশাপাশি, এই আর্কাইভের আরেকটি উদ্দেশ্য- যাঁরা বিংশ শতাব্দীর বাংলা সাহিত্যের ওপর কাজ করছেন বা ভবিষ্যতে করতে চান, বিশেষ করে সংরক্ষণ- সম্পর্কিত কাজ, তাঁদের সঙ্গে যৌথ ভাবে কাজ করার জন্য, এই আর্কাইভ আগ্রহী এবং আমরা একটি সহজ ভাষার নির্দেশিকা বানিয়েছি যেটি এই আর্কাইভে পাওয়া যাবে। আমাদের বিশ্বাস যেকোনও ধরনের পারিবারিক সংগ্রহ এবং তা সংরক্ষনের প্রয়াসকে কেন্দ্র করে উদীয়মান প্রাইভেট আর্কাইভগুলির কর্মপরিকল্পনায় এটি দিক নির্দেশ করতে সাহায্য করবে।”

যা যা থাকছে আর্কাইভে
এই আর্কাইভে সমরেশের জীবন এবং সাহিত্যের সঙ্গে জড়িত নানাবিধ স্মারক ও নথি, যথা আলোকচিত্র, চিঠিপত্র এবং পাণ্ডুলিপি, ডিজিটালি সংরক্ষণ করা হয়েছে। এর অধিকাংশই লেখকের কনিষ্ঠা কন্যা মৌসুমি সম্মাদার, কনিষ্ঠ পুত্র উদিত বসু এবং লেখকের কিছু ঘনিষ্ঠ বন্ধুবান্ধদের পারিবারিক সংগ্রহ থেকে পাওয়া। সংগ্রহের বিশেষ কিছু অংশ এই আর্কাইভের ওয়েবসাইটে ( www.samareshbasu.com ) দেখা যাবে। দেশ বিদেশের নানা পাঠক-পাঠিকার কাছে পৌঁছানোর জন্য এই ওয়েবসাইটটি বাংলা এবং ইরেজি, দুই ভাষাতেই থাকছে।

সমরেশ বসু ডিজিটাল আর্কাইভের আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করা হবে কলকাতা সেন্টার ফর ক্রিয়েটিভিটির সহযোগিতায়। স্থান: কলকাতা সেন্টার ফর ক্রিয়েটিভিটি, আম্ফিথিয়েটার। দিনক্ষণ: ২৬ এপ্রিল ২০২৫, বিকেল ৫টা-৮টা।

_______ 
ছবিসূত্র: সমরেশ বসু ডিজিটাল আর্কাইভ

Developed by DXDasia