
কলকাতায় আজও রয়েছে গ্রিক চার্চ। গ্রিক গোরস্তানও রয়েছে মৃতবৎ…
‘সত্য সেলুকাস! কী বিচিত্র এই দেশ…’ বলে একদা মুগ্ধ হয়েছিলেন গ্রিক সম্রাট আলেকজান্ডার। মহামান্য পুরুর মু-তোড় জবাবে বাকস্ফূর্তিহীন সম্রাটকে এরপর ছাড়তে হল ভারত বিজয়ের পরিকল্পনা। অগত্যা গ্রিসে ফিরে যাওয়ার সময় তিনি এদেশে রেখে গেলেন মেগাস্থিনিসকে। ইন্ডিকা লেখার জন্যে। আর, তারপরে তো কত স্রোতই না বয়ে গেল সিন্ধু ও গঙ্গায়। ‘যবন’ শব্দের অর্থ কালক্রমে বদলে হল ইসলাম। আরও কত অদলবদল ঘটেই চলল। ভারত আর গ্রিসে বাণিজ্যে-শিল্পে নানা আদানপ্রদানও গাঁথা হল কত যুগ যুগ ধরে। তবে, এখনো ভারতে গ্রিকদের আগমন বলতে সেই খ্রিস্টপূর্বাব্দের ঘটনাটাই মনে পড়ে। আমাদের নানান স্থাপত্যে, সংস্কৃতিতে গ্রিক ভাবনার মিশেল থাকলেও জনতার ভিতরেও যে গ্রিক-জিন বইছে, সে-কথা মনে হয়নি কখনো।
কিন্তু, এ ভাবনায় বাদ সাধে খোদ কলকাতারই একটি গির্জা। সাদা মার্বেল-দেওয়ালের অপূর্ব একটি ইমারত। তিনকোণা ছাদ। প্রার্থনাসভায় প্রবেশের জন্য রয়েছে তিনটি বিশাল দরজা।
ঘটনাটা বেশিদিন আগের নয়। হাজরা মোড় থেকে অটোতে রাসবিহারী আসছি। প্রায়ই আসি। প্রায়ই চোখে পড়ে। কিন্তু মনে ধরে না। বিনয় ঘোষ বলেছিলেন না, চোখ আর মনের মাঝে ডেডলাইন। তবে সেদিন সন্ধ্যায় কোনো কারণে লাইন জীবিত ছিল।

কালীঘাট ট্রামডিপোর কাছে লাইব্রেরি রোড আর রসা রোডের মাঝে দাঁড়িয়ে রয়েছে ভারত তথা এশিয়ার একমাত্র গ্রিক চার্চ। বিশুদ্ধভাবে বললে—‘গ্রিক অর্থোডক্স চার্চ’। চার্চের গায়ে গ্রিক হরফে লেখা ‘এখানে ঈশ্বর বাস করেন…’। দরজার পাশে রয়েছে আরো দুটি মর্মরফলক। গ্রিক স্থাপত্যে ব্যবহৃত ‘ডোরিক’ রীতিতে তৈরি এই গির্জা। তার দেওয়াল থেকেই জানা যায়, নির্মাণে সর্বাধিক অনুদান খোদ বড়োলাট ওয়ারেন হেস্টিংসের।
গ্রিক গির্জা যখন আছে, তখন এ শহরে গ্রিকজাতি থাকাও অনিবার্য। হিসেব করে দেখা গেল তাঁরা সত্যই আছে। বিলুপ্তির পথে হলেও একদা যে তাঁরা বহালতবিয়তেই ছিল কলকাতায়, তার প্রমাণ মেলে।
মূলত ষোড়শ শতাব্দী থেকেই গ্রিস দেশের মানুষ বাসা বাঁধতে থাকে বঙ্গ উপকূলে। গ্রিসে তখন অটোমান সাম্রাজ্য হুঙ্কার ছাড়ছে। ব্যবসাকে পুঁজি করেই উঠতি কলকাতা শহরের সঙ্গেও একটা সম্পর্ক গড়ে উঠতে থাকে। সপ্তদশ শতকের শেষে হেডি এলেক্সিয়াস আরগিরি (কোথাও কোথাও নামান্তর দেখা যায়) নামের এক গ্রিক ভদ্রলোক বাণিজ্যে দোভাষী হিসেবে কাজ করবে বলে এদেশে আসে। বাণিজ্যের কারণেই তাঁকে যেতে হত নানা জায়গায়। একবার তেমনি যেতে হয় মোচা ও জেন্ডা নামক দুটি স্থানে। শোনা যায়, এ যাওয়া ছিল বাণিজ্যের আড়ালে রাজনৈতিক কারণেই। স্বয়ং হেস্টিংস ছিলেন এই যাত্রার মূল উপদেষ্টা। আলেকজান্দ্রা নামক একটি জাহাজে রওনা হয় সে। কিন্তু সমুদ্রপথে দেখা দিল ভয়ানক সাইক্লোন। প্রবল ঝড়ে জাহাজ তো ডোবে-ডোবে অবস্থায়। আরগিরি তখন মঙ্গলময় ঈশ্বরের কাছে প্রার্থনা করে যে, ঝড় যদি থামে তাহলে কলকাতা পৌঁছেই সে তৈরি করবে একটি গ্রিক চার্চ।
আরও পড়ুন
ইতিহাস কথা বলে অফিসপাড়ার এই গির্জায়
ঝড় থামল। আর, শপথ-মতো কলকাতায় ফিরেই আরগিরি চেষ্টা করতে লাগলেন একটি চার্চ নির্মাণের। প্রসঙ্গত বলে রাখি, ১৭৫২-তেও কলকাতায় একটি গ্রিক চার্চ তৈরি হয়েছিল। খুব দ্রুতই সেটি বেখবর হয়ে যায়।
এরপর আরগিরির ইচ্ছানুসারে কলকাতার আমড়াতলা স্ট্রিটে ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন হয় গ্রিক চার্চের। সাল ১৭৭৮। ঠিক এর আগের বছরই মৃত্যু হয় আরগিরির, ৫ই অগাস্ট ১৭৭৭-এ, ঢাকায়। কিন্তু তাঁর সমাধি রয়েছে কলকাতার একমাত্র গ্রিক গোরস্তানে। ফুলবাগানের কাছে অবস্থিত সেই গোরস্তানের অবস্থাও যে শোচনীয় তা বলা বাহুল্য। শহরের নাগরিক অন্য যে গ্রিকেরা ছিল সেসময়, তারাই আরগিরির অসম্পূর্ণ কাজ শেষ করে।
এর বেশ কিছুকাল পর ১৯২৫-এর ১৯ নভেম্বর চার্চ কর্তৃপক্ষ চার্চটিকে নিয়ে আসেন কালীঘাট ট্রামডিপোর কাছে। চার্চটির স্থানান্তরের কারণ হিসেবে অনেকে মনে করেন, সার্কুলার রোড জুড়ে নিত্যদিনের কোলাহল থেকে মুক্ত হওয়াটাই ছিল মূল অভিপ্রায়। আমড়াতলায় ওই স্থান জুড়ে আজ বিশাল বিশাল ব্যবসা-প্রতিষ্ঠান। আর আজ যেখানে গির্জাটি অবস্থিত, একসময় তার নাম ছিল সাহেব-বাগান। সাহেবদের আমোদ-আহ্লাদের জায়গা হিসেবে বিখ্যাত। এই স্থানটিকেই বাছা হয় শেষপর্যন্ত। শহরের মূল কোলাহল থেকে দূরে থাকার জন্যে। যদিও আজ এই অঞ্চলে এলে সেই কোলাহল থেকে সরে আসার চেষ্টাকে হস্যকর মনে হতে পারে।

গির্জাটির এই সরে যাওয়া অনেকটাই যেন গ্রিকদের কলকাতা থেকে মুছে যাওয়াকে মনে করিয়ে দেয়। কলকাতার বুকে ১২০টি কবর সমন্বিত প্রাচীন গোরস্তানটি তো মুছেই যেতে বসেছে। সেই কবরগুলির গায়ে প্রস্তর ফলকে গ্রিকভাষায় লেখা মৃতদের পরিচয়। কিছু কিছু ফলকে অবশ্য রয়েছে ইংরেজি। সেখানে গ্রিক স্থাপত্যের অনেকগুলি চিহ্ন আটকে আছে আজও। তবে বড়োই মলিন, জীর্ণ।
আর গ্রিক চার্চটির অন্দরে রয়েছে অনেকগুলি প্রাচীন তৈলচিত্র। ক্রুশবিদ্ধ হওয়ার পরে মেরি ও যিশুর জীবনও ধরা আছে সেসব চিত্রে। রয়েছে দামি দামি বেশকিছু প্রাচীন আসবাব।
কলকাতায় অন্যান্য ইউরোপীয় জাতির সঙ্গে পাল্লা দিয়ে টিকে উঠতে পারেনি গ্রিক সম্প্রদায়। তাদের ব্যবসা ক্রমেই গুটোতে থাকে। আর আর্মানি ও ইংরেজদের সঙ্গে মিলেমিশে নিজেদের হারিয়েই ফেলে তারা শেষমেশ। ৪৭-পরে গ্রিকদের বংশধরেরা সকলেই প্রায় ভারত ছাড়ে।

তবুও, কলকাতার ইতিহাস লেখা হলে সেখানে ইংরেজদের দাপটের পাশাপাশি থেকে যাবে গ্রিস দেশ। সক্রেটিস প্লেটোর দেশ, বাইজান্টাইন সভ্যতার দেশ একদা কলকাতাতেও তার ডানা মেলেছিল, ভাবলেই শিহরণ জাগে। স্মৃতির পাঁজর হাতড়ালে তাদের দীর্ঘশ্বাস শোনা যায় আজও।
শক্তি চট্টোপাধ্যায়ের একটি কবিতায় ছিল–
“কিছুক্ষণ আগে গ্রীস থেকে বেড়িয়ে ফিরলাম আমি/ যারা যারা আমায় নিমন্ত্রণ করে নিয়ে গিয়েছিল/ তাদের সকলের সমাধি আমি অন্ধকারে এসেছি দেখে/এপিটাফ এপিটাফ এপিটাফে ভরে গিয়েছি আমি…”
এই শহরে এভাবেই ছড়িয়ে আছে গ্রিস-সহ আরো অনেক জাতির এপিটাফ।
ছবি: তর্পিণী ভুঁইঞা
