
১২.৫০ একর জায়গা জুড়ে অবস্থান এই চিড়িয়াখানার
বাংলায় বসন্তের আগমন যেন আমাদের রোজকার কর্মব্যস্ত বিস্বাদ জীবনকে মুহূর্তে সুন্দর করে তোলে। আর এই বসন্ত উদযাপন করতে যদি কোনো এক সপ্তাহান্ত কাটানো যায় পশুপাখিদের মাঝে, তার চাইতে ভালো আর কীই বা হতে পারে! শুধুমাত্র চিড়িয়াখানাকেই যে পর্যটন কেন্দ্র হিসাবে গড়ে তোলা যায়, এ কথা বহু আগেই প্রমান করেছে সিঙ্গাপুর ও থাইল্যান্ড। এবার সেই তালিকাতেই আরও একবার নতুন ভাবে জুড়ে গেল কলকাতা শহরের নাম। ব্রিটিশ আমল থেকেই এশিয়া মহাদেশের সর্ববৃহৎ চিড়িয়াখানাটির প্রতিষ্ঠাস্থল হিসাবে গর্ববোধ করেছে কলকাতা। কলকাতার আজন্ম-প্রাচীন ‘আলিপুর চিড়িয়াখানা’ হল ভারতের সব চাইতে পুরোনো এবং সব চাইতে বড়ো জুলজিক্যাল পার্ক। গত ৯ ফেব্রুয়ারি ২০২৩-এ, পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মাননীয়া মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় কলকাতার নিউ টাউন এলাকায় উদ্বোধন করেন ‘হরিণালয়’-এর। পূর্বে নিউ টাউন জু নামে পরিচিত এই চিড়িয়াখানাটিতে সম্প্রতি পুনর্নির্মাণ ও সংস্করণের কাজ করা হয়েছে। আশা করা যায়, কলকাতা ও আশেপাশের এলাকার মানুষের কাছে নতুন আকর্ষণ হয়ে উঠবে হরিণালয়।
১২.৫০ একর জায়গা জুড়ে ছড়িয়ে থাকা এই চিড়িয়াখানাটি ইকো পার্ক-এর গেট নং ৬-এর কাছে অবস্থিত। ২০১৬ সালে মূলত একটি ‘ডিয়ার পার্ক’ হিসাবে শুরু হয় এর কার্যকলাপ। পরবর্তীতে এখানকার স্তন্যপায়ী ও পক্ষী সংগ্রহশালাটিতে কিছু সংযোজন করা হয়। অবশেষে এই মাসে জনসাধারণের জন্য খুলে দেওয়া হয় হরিণালয়ের দরজা। সিঙ্গাপুরের অত্যন্ত জনপ্রিয় জুরোং বার্ড পার্কের দেখানো পথে এগিয়েই প্রায় ১০০-এরও বেশি প্রজাতির পাখির আশ্রয়স্থল হয়ে উঠেছে নিউ টাউনের হরিণালয়। এই পাখিগুলির কিছু আনা হয়েছে আমাজনের রেইনফরেস্ট থেকে। কিছু বা আবার আফ্রিকা ও অস্ট্রেলিয়ান উপকূলবর্তী এলাকাগুলি থেকে আমদানি করা হয়েছে।

আপনি যদি পাখিপ্রেমী বা পাখিবিশারদ হন, তাহলে হরিণালয়ে পা রাখামাত্র রংবেরঙা ম্যাকাও এবং গ্রেটার সালফার-ক্রেস্টেড কাক্কু’র মনমোহিনী ডাকে আপনার হৃদয় জুড়িয়ে যাবে। কেবলমাত্র অসাধারণ রঙ-বৈচিত্রের জন্যই নয়, মানুষের অনুকরণে শব্দ বা বাক্য উচ্চারণের জন্য বিশ্ব জুড়ে পরিচিত এই পাখিগুলি। ম্যাকাও পাখি বর্তমানে বিপন্ন প্রাণীদের তালিকায় জায়গা করে নিয়েছে, ফলে এদের সংরক্ষণ করবার প্রয়োজনীয়তা আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে সময়ের সঙ্গে। চিড়িয়াখানায় বেড়াতে আসা স্কুলপড়ুয়াদের মধ্যেও পাখিবিষয়ক সচেতনতা তৈরি করতে সাহায্য করবে ভিন্ন প্রজাতির এই পাখিগুলি। ম্যাকাও-এর কাছেই রয়েছে পরিযায়ী রাজহাঁসদের আবাস। লাল ঠোঁটওয়ালা কালো পালকের এই রাজহাঁসদের দেখতে প্রায়ই ভিড় জমে ওঠে এখানে।

এখনও অবধি মূলত তৃণভোজী প্রানিদেরকেই রাখবার বন্দোবস্ত করা হয়েছে ‘হরিণালয়’-এ, যার মধ্যে রয়েছে জিরাফ, জেব্রা এবং একটি জলহস্তী। যারা নিয়মিত আলিপুর চিড়িয়াখানার বিষয়ে খবরাখবর রাখেন, তাঁরা হয়তো জানবেন, চিড়িয়াখানা কর্তৃপক্ষের উদ্যোগে সফল প্রজনন প্রোগ্রামের কারনে বর্তমানে জিরাফ ও জেব্রার সংখ্যা যথেষ্ট পরিমাণে বৃদ্ধি করা গেছে। গত বছরের ডিসেম্বর মাসে আলিপুর চিড়িয়াখানা থেকেই এখানকার দুই পুরোনো বাসিন্দা জিরাফ রামু ও সোনিয়াকে হরিণালয়ে স্থানান্তরিত করা হয়েছে। এরই সঙ্গে আনা হয়েছে এক জেব্রা যুগল ও একটি দশাসই জলহস্তীকে। হরিণালয়ের আদি বাসিন্দারা হল একপাল হরিণ, যার মধ্যে রয়েছে ২৪টি চিতল হরিণ বা স্পটেড ডিয়ার এবং ৪টি মায়া হরিণ বা বারকিং ডিয়ার। খুব সম্ভবত এদের উপস্থিতিই নিউ টাউন জু’কে ‘হরিণালয়’ হয়ে উঠতে সাহায্য করেছিল।
মাংসাশী প্রাণী বলতে আপাতত কেবলমাত্র কয়েকটি সল্ট ওয়াটার ক্রোকোডাইল ও কয়েকটি মার্শ ক্রোকোডাইলকে জলাভূমির ধারে রোদ পোহাতে দেখতে পাবেন আপনি। আর পাবেন মারশুপিয়াল সুগার গ্লাইডার নামের পোসাম শ্রেণীর অন্তর্ভুক্ত এক বিশেষ ধরনের প্রানী যারা সর্বভুক হয় এবং মূলত গাছের উপরেই বসবাস করে। ভবিষ্যতে বাঘ এবং সিংহের মতো প্রানীও চিড়িয়াখানায় আনবার ইচ্ছে প্রকাশ করেছেন চিড়িয়াখানা কর্তৃপক্ষ। এছাড়াও পরবর্তীকালে হিমালয়ান ব্ল্যাক বিয়ার, লেপার্ড ফিশিং ক্যাট, এবং লেপার্ড ক্যাটের মতো অনন্য প্রজাতির কিছু মাংসাশী প্রানিকে চিড়িয়াখানায় আনা হবে।

এখানে আপনি দেখতে পাবেন আমাজন জঙ্গলের বাসিন্দা, সাদা ঠোঁট ও লাল পেটযুক্ত ‘হোয়াইট লিপড ট্যামারিন মাঙ্কি’, ঝাঁক বেঁধে এ ডাল থেকে ও ডালে ঘুরে বেড়ানো ‘আফ্রিক্যান মোনা মাঙ্কি’ এবং মজাদার মুখভঙ্গির রাজা ‘মারমোসেট’দের। কানে আসবে ‘হুলক গিবন’দের সুতীব্র ডাক। HIDCO-এর ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা অনুযায়ী, চিড়িয়াখানাটির জন্য বরাদ্দ করা হবে আরও বেশি পরিমাণ জমি। সরীসৃপদের রাখবার একটি পরিবেষ্টিত ঘেরাটোপও হয়ে উঠবে চিড়িয়াখানার অংশ, যেখানে সর্পপ্রেমীদের জন্য রাখা হবে ‘রেটিকুলেটেড পাইথন’, ‘ইন্ডিয়ান রক পাইথন’, ‘বল পাইথন’ এবং ‘বার্মিজ পাইথন’-এর মতো নানা প্রজাতির বিশালাকায় পাইথন। এছাড়া বাংলার অতি পরিচিত গোসাপেরাও (ওয়াটার মনিটর লিজার্ড) জায়গা পাবে এই ‘রেপ্টাইল এনক্লোজার’টিতে।

দর্শকদের মনোরঞ্জনের পাশাপাশি উদরপূর্তিও যাতে সুষ্ঠুভাবে হতে পারে সে বিষয় মাথায় রেখে চিড়িয়াখানা চত্বরের মধ্যে তৈরি করা হয়েছে একটি ফুড কোর্ট। রয়েছে ‘চাইল্ড কেয়ার রুম’ও, যেখানে প্রয়োজনে কিছু সময়ের জন্য সন্তানকে রাখতে পারবেন বাবা মা। চিড়িয়াখানাটিকে তৈরির ক্ষেত্রে, সেটিকে যতদূর সম্ভব পরিবেশ বান্ধব করা যায়, তা খেয়াল রেখেছেন কর্তৃপক্ষ। চিড়িয়াখানার তরফ থেকে ভবিষ্যতে এখানে বন্দি পাখি প্রজনন কেন্দ্র এবং দেশীয় প্রজাতির প্রাণীদের উপর গবেষণামূলক কাজ করার প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছে, যা বাংলার উদ্ভিদ ও প্রাণীজগতের বিকাশে সাহায্য করবে।
পৌঁছাবেন কীভাবে?
ইকো পার্কগামী যেকোনো বাসে উঠে বসুন। নেমে পড়ুন গেট নং ৬-এর সামনে। উল্টোদিকে তাকালেই দেখতে পাবেন হরিণালয়ের সদর দরজা।
সময় – সকাল ১০টা থেকে বিকেল ৫টা
টিকিটের মূল্য – ৩০ টাকা জন প্রতি
