
তিনিই আসলে বেতার নাটকের জীবন্ত এনসাইক্লোপিডিয়া
সত্যজিৎ রায়ের ‘কাঞ্চনজঙ্ঘা’ তখন মুক্তি পেয়ে গিয়েছে। পরিচালকের কাছে কলকাতা বেতারের নাট্য-প্রযোজক অজিত মুখোপাধ্যায় এসে বললেন, “কাঞ্চনজঙ্ঘা খুব ভালো লেগেছে। তাই রেডিও নাটক করে দেখতে চাই।” এমন প্রস্তাব শুনে প্রথমে রাজি হননি সত্যজিৎ রায়। চলচ্চিত্র রূপে যা দর্শক গ্রহণ করেছেন, তা কি বেতার নাটকে মানানসই হবে? এই সন্দেহে সরাসরি প্রযোজককে না বলে দিলেন তিনি। কিন্তু প্রযোজকও নাছোড়বান্দা। সত্যজিৎ খানিক ভেবে জিজ্ঞাসা করলেন, স্ক্রিপ্ট কে লিখবেন? উত্তর আসে, অজিতেশ বন্দ্যোপাধ্যায়। এরপর পরিচালক আর না করেননি। পরবর্তীকালে ‘কাঞ্চনজঙ্ঘা’ বেতার নাটক তৈরি হয়েছিল। তুমুল জনপ্রিয়তাও পেয়েছিল।
শম্ভু মিত্র, উৎপল দত্ত, বিকাশ রায়, বসন্ত চৌধুরী থেকে অজিতেশ কিংবা সৌমিত্র — একসময় কলকাতা বেতার এই দিকপাল অভিনেতাদের দিয়ে নাটক করিয়েছে। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর থেকে বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায় হয়ে শ্যামল গঙ্গোপাধ্যায় পর্যন্ত, কার লেখা সাহিত্য নিয়ে বেতার নাটক তৈরি হয়নি! এই নাটকের তথ্যানুসন্ধানী, গবেষক, অধ্যাপক নিখিলরঞ্জন প্রামাণিক বলছিলেন, “বীরেন্দ্রকৃষ্ণ ভদ্র, বাণীকুমার, শ্রীধর ভট্টাচার্য, পরবর্তীকালে অজিত মুখোপাধ্যায়, জগন্নাথ বসু, সমরেশ ঘোষ, শুক্লা বন্দ্যোপাধ্যায়, পাপিয়া চক্রবর্তী প্রমুখ স্বনামধন্য প্রযোজকদের হাত ধরে শ্রাব্য-নাটকের ক্রমেই শ্রীবৃদ্ধি ঘটেছে।” এখানেই থামেননি অধ্যাপক। এ সব নিয়ে তিনি অনর্গল কথা বলে যেতে পারেন। আদতে তিনিই যে বেতার নাটকের জীবন্ত এনসাইক্লোপিডিয়া। হ্যাঁ, কোনো অত্যুক্তি নয়, নিখিলরঞ্জন প্রামানিক এমনই। দীর্ঘ পাঁচ দশক ধরে শুনছেন আকাশবাণী কলকাতার বেতার নাটক। অর্থাৎ, এ তার বেতার শ্রুতির সুবর্ণ জয়ন্তী।
সেই সাতের দশক থেকে তিনি শুরু করেছেন বেতার নাটক শোনা। শুক্রবার রাত আটটা, রবিবার দুপুর আড়াইটে কিংবা প্রথম সপ্তাহ বাদ দিয়ে প্রতি বৃহস্পতিবারের রাত সাড়ে ন’টা আজও কলকাতা ‘ক’-এ (গীতাঞ্জলি) বেতার নাটকের জন্য উৎসর্গ করা থাকে। মন দিয়ে শোনার সময় কোনো কিছুই তাঁকে বিচলিত করতে পারে না। রীতিমত দিস্তা দিস্তা কাগজে বা ডায়েরিতে সে সব নথিভুক্ত করা আছে। প্রায় ১৫-১৬ হাজার বেতার নাটক শুনেছেন পঞ্চাশ বছর ধরে। কবে কোন নাটক প্রচারিত হল, তা টুকে রাখেন ডায়েরিতে। আকাশবাণী থেকেও বহু ফোন পান তিনি। বেতার নাটকের তথ্য তাঁর থেকে কে ভাল জানবে! আকাশবাণীর এক রাতের অনুষ্ঠানে নিখিলবাবুর স্মৃতির পরিচয় পেয়ে রুদ্রপ্রসাদ সেনগুপ্ত বললেন, “রেডিও নাটকের কোনো শ্রোতা যে এত নিঁখুতভাবে নাটক শুনে সংলাপ এমন মুখস্ত রাখতে পারে, এ আমার ধারণা ছিল না।”
পেশায় রসায়নের অধ্যাপক হলেও তাঁর নেশা বেতারে। অধ্যাপনা যেমন তাঁর জীবিকা, তেমনি পর্ণশ্রীর ফ্ল্যাটজীবনে আনন্দ ও একাকীত্বের সঙ্গী একটি রেডিও সেট তাঁর জীবন। আধুনিক লাইফস্টাইলে টেলিভিশন থাকলেও তিনি আদতে ‘কান দিয়ে দেখা’-তে বিশ্বাসী। সকাল ছ-টায় তাঁর রেডিও বেজে ওঠে। চাকরির সময়টুকু বাদ দিয়ে রেডিও সর্বক্ষণের সঙ্গী। তাই আত্মীয়ের বাড়ি বেড়াতে গেলেও ব্যাগের ভেতরে রেডিও ঢুকিয়ে নেন। গ্রামের বাড়িতেও একখানি রেডিও মজুত আছে।
রেডিওর প্রতি আকর্ষণের সূত্রপাত কী করে? তথ্য সংগ্রাহক নিখিলবাবু বলেন, “হাওড়ার মাধবপুরে অজ গাঁয়ে আমার পৈতৃক বাড়ি। বিনোদনের মাধ্যম বলতে একমাত্র এই রেডিওটাই। ছাত্রাবস্থায় পরীক্ষার সময়েও রেডিও নাটক বাদ দিতাম না। তখন বাড়তি সময়ে পড়ে নিয়ে নাটক শুনতাম। এ ভাবেই ধীরে ধীরে রেডিও নাটক আমার জীবন হয়ে উঠল।” বেতার নাটকের অনুসন্ধানী নিখিলবাবুর সঙ্গে ক্রমেই আলাপ জমে উঠল সে যুগের প্রযোজকদের। অজিত মুখোপাধ্যায়, সমরেশ ঘোষ, ডঃ দীপকচন্দ্র পোদ্দারদের সঙ্গে মিশতে মিশতে জানতে থাকলেন নাটকের নেপথ্য কাহিনি। সে সব থেকেই উঠে আসে কত ঘটনা।
‘শুনো বরনারী’ রেকর্ডিংয়ের দিন অভিনেতা বিকাশ রায়ের ১০৪ ডিগ্রি জ্বর। গায়ে কম্বল মুড়ি দিয়ে চেয়ারে বসে রেকর্ড করেছিলেন তিনি। আবার সারা কলকাতা জলে ডুবে গেলেও শাঁওলি মিত্র আকাশবাণীতে নাটক রেকর্ড করতে এসেছিলেন। বেতার নাটকের প্রতি শিল্পীদের এই ভালোবাসাটা ছিল। তাই কি অভিনয়ের এত মাধ্যম থাকতে অধ্যাপকও বিশেষত্ব খুঁজে পেলেন বেতার নাটকে? তিনি বলেন, “অভিনয়ের সব মাধ্যমগুলিই দৃশ্য মাধ্যম। বেতারই শ্রাব্য মাধ্যম। সমস্তটাই কণ্ঠ নির্ভর। আমার মতে, এই মাধ্যমে অভিনয় অনেক বেশি চ্যালেঞ্জিং, কঠিন। মানুষের কল্পনাশক্তি বাড়িয়ে তুলতে সাহায্য করে। আমার সারা সপ্তাহের পড়াশুনোজনিত যে ক্লান্তি, সেটা রেডিও নাটক শুনেই দূর হয়।” তাঁর নিজের নাট্যরূপ দেওয়া ‘জামগাছ’ নাটকটি সম্প্রচারিত হয়েছে আকাশবাণীতে। বেতার নাটক নিয়ে অসংখ্য লেখালেখি করেছেন পত্র-পত্রিকায়। ১৯২৭-২০১২ সাল অবধি কালানুক্রমিক উল্লেখযোগ্য নাটকের একটি তালিকাও প্রকাশ করছেন ‘কলকাতা বেতার’ নামক গ্রন্থে।
স্মৃতি হাতড়ে হাতড়ে তিনি অনায়াসে দিয়ে চলেন শ্রাব্য নাটকের ধারাবিবরণী। সাহিত্যনির্ভর নাটক যেমন হয়েছে, তেমনি সাহিত্যনিরপেক্ষ নাটকও হয়েছে। নারায়ণ গঙ্গোপাধ্যায়ের ‘নিশিযাপন’ রেডিও নাটক শুনেই সন্দীপ রায় সিনেমা তৈরি করেছিলেন। আবার তাপস পাল অভিনীত ‘সাহেব’ চলচ্চিত্রে রূপায়িত হওয়ার আগে শ্রাব্য-নাটকই তো হয়েছিল। এ রকম কত তথ্য ও রোমাঞ্চকর কাহিনি অধ্যাপকের ঝুলিতে। হইহই করে বলে চলেন বেতার নাটকের এক সোনালি সময়ের গৌরবময় গাথা। মলিনা দেবী, তৃপ্তি মিত্র, সাবিত্রী চট্টোপাধ্যায়, মঞ্জু দে, নির্মল কুমার, ছবি বিশ্বাস, ভানু বন্দ্যোপাধ্যায় – কারা নেই সেই ধারাবিবরণীতে! “আজকের বাঙালি প্রজন্ম অবশ্য রেডিও নাটক বলতে কী আর বোঝে?” আক্ষেপ ঝরে পড়ল অধ্যাপকের কণ্ঠে।
ইডেন হিন্দু হোস্টেলের সুপার থেকে রসায়নের অধ্যাপকের পর্ণশ্রীর বাড়ি অবধি – জার্নিটা অনেক লম্বা। চিরকাল সঙ্গী থেকেছে বালিশের পাশে থাকা একটা রেডিও ‘বাহাদুর’। তিনি বলেন, “যে মিডিয়াতেই অভিনয় করো না কেন, ভালো অভিনয় শিখতে গেলে রেডিও নাটকের বিকল্প নেই।” বিকল্প নেই এই তপস্বী মানুষটিরও। তেমনই মত প্রবীণ নাট্য অভিনেতা ও নাট্যকার সৌম্যদেব বসুর। তিনি বলেন, “ফটোগ্রাফিক মেমোরি নিখিলের। নিখিলের যে কোনো নাটক গড়গড় করে বলে দেওয়াটা অকল্পনীয়।” আর খ্যাতনামা প্রযোজক সমরেশ ঘোষ বলেন, “আমি নাটকের নাম ভুলে গেলেও বেতার নাটকের ভাণ্ডারী নিখিল ঠিক মনে করে রাখে। শুধু আমার কেন, প্রতিটা নাটক নিখিল মনে রাখে।”
