
বর্গিদের ভয়ে পরিখা কাটল সাধারণ কলকাতাবাসীই
সেসব বহুকাল আগের কথা। কলকাতা বলতে তখন একটুকরো গ্রাম। যার অধিকাংশটাই বাগান, ডোবা, খানাখন্দ, পগারে ভরা। সব জায়গার নামকরণও হয়নি তখনও। পাকাবাড়ি প্রায় নেই। একটা কেল্লা অবশ্য গজিয়েছে গঙ্গার পাড়ে। সে কেল্লার দেওয়ালও মাটির। হ্যাঁ, সাহেবদের আনাগোনা বাড়ছে অবশ্য। নিত্যদিনই গঙ্গার বুকে জাহাজ আসে। সেখান থেকে লাফ দিয়ে নামে গোরা সাহেবের দল। কলকাতায় তখন ঝামেলা খুব বেশি নেই। বরং, কোনো ঝামেলা এলে সাহেবরাই সামাল দেয়। সামাল দেয় অবশ্য নিজেদের স্বার্থেই। তাতে অন্তত সাময়িক ফায়দা মেলে নেটিভদের।
তবে, একবার সাহেবরা ফেল মেরে গেল। কলকাতার লোকজন তখন বাধ্য হল আত্মরক্ষায় উঠে-পড়ে লাগতে। কিন্তু ইতিহাসের পরিহাস এমনি, তাতেই কলকাতাবাসীর নাম হয়ে গেল ডিচার অর্থাৎ পরিখা-কাটা পাবলিক আর কী! একটা অঞ্চলের মানুষের পরিচিতি পরিখাময় হয়ে ওঠা খুব গৌরবের নয় মোটেই। কিন্তু, এমনটাই ঘটেছিল।

আজকের কলকাতায় দাঁড়িয়ে সেসব কল্পনাই করা যায় না। হাওড়া ব্রিজের রেলিঙে হেলান দিয়ে গঙ্গা দেখতে দেখতে ভুলেও মনে হয় না, এই গঙ্গায় একদা ঘুরে বেড়াত যুদ্ধ জাহাজ। যেমন বাগবাজার ঘাটে একবার পাহারা দিচ্ছিল ব্রিটিশ জাহাজ টাইগ্রিস। সেটা আঠেরো শতকের প্রথমার্ধ। শহরের ইতিউতি বসেছে কামান। বেশ একটা যুদ্ধ-যুদ্ধ ভাব চারদিকে। কিন্তু কাকে ঠেকাতে এহেন আয়োজন? পর্তুগিজ বা ফরাসি বা ওলন্দাজদের মতো হুদ্দোমুদ্দোরা নয়। আমাদের দেশের মারাঠাদের ঠেকাতেই শহরের সাত জায়গায় বসেছিল কামান। যদিও এ আয়োজনও ছিল বেশ নগণ্য। কলকাতার লোকজন তাতে মোটেই নিশ্চিন্তি বোধ করেনি। মধ্যযুগের শেষার্ধে ভারত রাষ্ট্রের ধারণা তৈরি হয়নি। তাই অন্য অনেক জাতির মতো মারাঠাও দস্যুর বেশে আক্রমণ চালাত বাংলা, বিহার, উড়িষ্যার ওপর। নির্দয় লুঠপাট, খুনখারাপি চালাত। ‘স্বদেশীয়’ বলে সামান্য করুণাও মিলত না। আরবসাগর পাড়ের ভয়ঙ্কর মারাঠাদের লুঠতরাজ থেকে বাঁচতে কলকাতাবাসী তাই সেদিন বাধ্য হয়েছিল টেমস নদীপারের মানুষদের কাছে আশ্রয় চাইতে।
১৭৪০ সালে নবাব আলিবর্দি খাঁ বসলেন বাংলার মসনদে। আর, তখনকার দিনে যা হত আর কি, মসনদে বসার আগে একচোট যুদ্ধ। বসার পরে তো সর্বক্ষণই যুদ্ধ। আজ অমুকের আক্রমণ, তো পরশু তমুকের। আলিবর্দির ক্ষেত্রেও একই ঘটনা। সিংহাসন দখলের দু-বছরের মধ্যে ১৭৪২-এর এপ্রিল মাসে তিনহাজার ঘোড়সওয়ার আর একহাজার পদাতিক সেনা নিয়ে মারাঠা থেকে উজিয়ে এলেন ভাস্কর পণ্ডিত, আমাদের বর্ধমানে। চৌথসহ অন্যান্য কর আদায় করতে। শুধু আদায় করা কি আর কাজ? মারধোর, লুঠতরাজ চলল। ‘মহারাষ্ট্র পুরাণে’ যার বর্ণনা দিয়ে গেছেন স্বয়ং গঙ্গারাম চক্রবর্তী–
“এই মতে জত সব গ্রাম পোড়াইয়া
চতুর্দ্দিকে বরগি বেড়াএ লুটিয়া।।
কাহুকে বাঁধে বরগি দিয়া পিঠ মোড়া
চিত কইরা মারে লাথি পায়ে জুতা চড়া।।
রুপি দেহ দেহ বোলে বারে বারে
রুপি না পাইয়া তবে নাকে জল ভরে।।”
বাংলার প্রতি ঘরে ঘরে চলেছিল লুঠ। নারীর ওপর অকথ্য অত্যাচার তো আছেই। আলিবর্দি খাঁ প্রথমে জুত করে উঠতে পারেননি ভাস্কর পণ্ডিতের সঙ্গে। পালিয়ে বেঁচেছিলেন। ১৭৪২-এর ৬ই মে সারাদিন বাংলার রাজধানী মকসুদাবাদে লুট চালায় ভাস্কর পণ্ডিত। পরে বেশ কৌশল করে ভাস্করজিকে ঘরে ডেকে হত্যা করেন বাংলার নবাব। মারাঠা দস্যুরা অবশ্য তারপরেও অপ্রতিরোধ্য। ফের আসে রঘুজি ভোঁসলে। কখনো বাংলার গ্রামাঞ্চল, কখনো উড়িষ্যায় তারা ঘাঁটি গড়ে আর লুঠ চালায়। আর তাদের ধাওয়া করতে করতে ছুটে মরেন আলিবর্দি খাঁ। এসবের জন্যই তো ওই ছড়াটার সৃষ্টি: ‘ছেলে ঘুমোলো পাড়া জুড়োল/ বর্গি এল দেশে/ বুলবুলিতে ধান খেয়েছে/ খাজনা দেব কি সে…’
শিবাজির দেশ মহারাষ্ট্র থেকে আসা ভয়ঙ্কর বর্গিদের কথা ‘অন্নদামঙ্গলে’ লিখে গেছেন ভারতচন্দ্রও।
চারপাশে এসব হচ্ছে যখন, কলকাতার লোকদেরও মনে ভয় চেপে বসল। এই বুঝি বর্গির দল আসে। ইংরেজ সাহেবরা যেটুকু ব্যবস্থা করেছে তা বিপুল মারাঠা শক্তির কাছে নস্যি। তাই কলকাতার মানুষ নিজেরা ঠিক করল, তারা শহর জুড়ে খাদ কাটবে। সাত মাইল লম্বা ৪২ গজ চওড়া খাদ। কোম্পানির কাছ থেকে আগাম টাকা নেওয়া হল। ২৫০০০টাকা। বৈষ্ণবচরণ শেঠ, রামকৃষ্ণ, রাসবিহারী ও উমিচাঁদরা প্রতিশ্রুতিবদ্ধ হলেন যে জনগণ এই টাকা ফিরত দেবে। গোটা কলকাতা উপুড় হয়ে পড়ল খাদ কাটতে। ছয় মাসের মধ্যে তিন মাইল খাদ কাটাও হয়ে গেল। মারাঠা যদি আক্রমণ করেও, ব্যাটারা যেন ওই পরিখায় আছাড় খেয়ে মরে– এই আশায়।
পুরনো কলকাতার মানচিত্রে মারাঠা ডিচ
বাগবাজার স্ট্রিট থেকে শুরু করে যানবাজার হয়ে বেগবাগান পর্যন্ত দৌড়ল খাদ। তারপর থেমে গেল। খাদ আর সম্পূর্ণ হল না। মারাঠাদের সঙ্গে কী একটা রফা হয়ে গেল নবাবের। ফলে, অনেক কষ্টে তৈরি মারাঠা ডিচ আধাখেঁচড়া হয়ে থেকে গেল। পরে, ১৭৯৯-তে তার ওপরেই তৈরি হল আপার ও লোয়ার সার্কুলার রোড। খানিকটা হ্যারিসন রোডও। আর বাকিটা নাকি শহরের জঞ্জাল জমেই বন্ধ হল। বাগবাজারের মারাঠা ডিচ রোড নামে আজও সেই স্মৃতি রয়েছে। সেই স্মৃতি কলকাতার আত্মরক্ষার স্মৃতি।
তবে, মধুর স্মৃতিতেও অম্লের স্বাদ মেশে মাঝে মাঝে। বর্গিরা এল না। কিন্তু, কলকাতাবাসীর এহেন হামলে পড়ে খাদ কাটার বহর দেখে চারিদিকে তাদের একটা নতুন নাম রাষ্ট্র হয়ে গেল। ডিচার। পরিখা-কাটা মানুষ। হায় কল্লোলিনী তিলোত্তমার নবজাগরণের আলোকপ্রাপ্ত, সংস্কৃতিমনস্ক নাগরিকগণ! মারাঠা দস্যুরা না এসেও কম ক্ষতি করেনি আমাদের পূর্বপুরুষপদের। ভাতে মারেনি বটে, কিন্তু নাম খারাপ করে দিয়ে গেছে।
কিছুদিনের জন্য হলেও সে কি কম কষ্টের ব্যাপার!
