সুভাষ ও এমিলি – কালের অতলে তলিয়ে যাওয়া এক প্রেমকাহিনি

জার্মানিতে বিদেশি নাগরিককে বিয়ে করার ঝঞ্ঝাট এড়াতে গোপনে হিন্দুমতে বিবাহ করেছিলেন এমিলি এবং সুভাষ

১৯৩৫ সালে কার্লসবাডে সুভাষচন্দ্র বসু এবং এমিলি শেঙ্কেল 

ইউরোপে যে স্ত্রী এবং এক শিশুকন্যা রেখে গিয়েছেন তিনি, একথা নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসু নিরুদ্দেশ হয়ে যাওয়ার বছরখানেক পরেও তাঁর পরিবারের কেউ জানতেন না, বাইরের দুনিয়ার কেউ তো নয়ই। আজও অনেকেই মনেপ্রাণে বিশ্বাস করেন, নেতাজি কোনোদিন বিবাহই করেন নি, সন্তানের জন্ম দেওয়া তো দূরের কথা। 

‘দ্য বোস ব্রাদার্স অ্যান্ড ইন্ডিয়ান ইন্ডিপেন্ডেনস, অ্যান ইনসাইডারস অ্যাকাউন্ট’ শীর্ষক বইতে লেখিকা মাধুরী বসু সবিস্তারে লিখেছেন, কীভাবে নেতাজির স্ত্রী এমিলি শেঙ্কেল, যিনি জন্মসূত্রে অস্ট্রীয় হলেও জার্মানির প্রজা ছিলেন, ১৯৪৬ সালে নেতাজির দাদা শরৎচন্দ্র বসুকে চিঠি লিখে জানান, জার্মানিতে বিদেশি নাগরিককে বিয়ে করার ঝঞ্ঝাট এড়াতে কেন গোপনে হিন্দুমতে বিবাহ করেছিলেন তিনি এবং সুভাষ। কীভাবে তাঁরা কন্যার নাম ‘অমিতা ব্রিজিট’ না রেখে ‘অনিতা ব্রিজিট’ রেখেছিলেন, যাতে জার্মান কর্তাদের সন্দেহ না হয়। চিঠিতে এমিলি স্পষ্ট করে দেন, কোনোরকম আর্থিক সাহায্য চান না তিনি, স্রেফ অনিতার অস্তিত্ব সম্পর্কে সুভাষের পরিবারকে অবগত করতে চান, যাতে তাঁর কিছু হলে মেয়ের দেখাশোনায় কোনও বিঘ্ন না ঘটে। 

যদিও তিনি অন্তর থেকে বিশ্বাস করতেন যে তাঁর ছোটো ভাই ব্রিটিশ সরকারের কথা অনুযায়ী চিনা তাইপেই-তে বিমান দুর্ঘটনায় প্রাণ হারাননি, ভ্রাতৃবধূ এবং ভাইঝিকে মেনে নিতে কোনোরকম অসুবিধে হয়নি শরৎবাবুর। এ ব্যাপারে নির্ঘাত কাজে লেগেছিল সুভাষের নিজের হাতে বাংলায় লেখা একটি চিঠি, যা তিনি এমিলির কাছে রেখে গিয়েছিলেন, তাঁর কিছু হয়ে গেলে যাতে তাঁর পরিবারের হাতে তা তুলে দেওয়া যায়।

এমিলিকে লেখা সুভাষচন্দ্রের চিঠি 

বস্তুত, নেতাজি এবং তাঁর একদা সেক্রেটারির মধ্যে যে প্রেমের সম্পর্ক তৈরি হয়েছিল, তা বুঝতে অনেকাংশেই নির্ভর করতে হয় চিঠির ওপর। ‘দ্য ইন্ডিয়ান স্ট্রাগল’ বইটি লেখার সময় নেতাজির সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে কাজ করেছিলেন এমিলি, যিনি শরৎচন্দ্রকে লেখেন, “আপনার ভাই ১৯৪১ সালে আরও একবার ইউরোপে আসেন, জানতে চান, আমি বার্লিনে তাঁর কাছে গিয়ে কাজ করতে পারব কিনা। আমি রাজি হই, এবং ১৯৪১ সালের এপ্রিল মাসে তাঁর সঙ্গে যোগ দিই, যার পর আমরা ১৯৪২ সালের হেমন্তকাল পর্যন্ত কাজ করি। বার্লিনে থাকাকালীন আপনার ভাই আমার কাছে জানতে চান, তাঁর বিবাহের প্রস্তাব আমি গ্রহণ করব কিনা। যেহেতু আমি তাঁকে বহু বছর ধরে চিনতাম, তাঁকে সচ্চরিত্র বলে জানতাম, এবং আমাদের পরস্পরের প্রতি অনুরাগ ছিল, আমি রাজি হই।”

এই অনুরাগের বিবরণ উভয়ের চিঠিপত্র পড়লে মোটামুটি স্পষ্ট হয়ে যায়। এক্ষেত্রে বিশেষভাবে কাজে লাগে ১৯৯৪ সালে প্রথম প্রকাশিত ‘লেটারস টু এমিলি শেঙ্কেল, ১৯৩৪-১৯৪২’ বইটি, যা সম্পাদনা করেন নেতাজির ভাইপো শিশির কুমার বসু এবং তস্য পুত্র সুগত বসু। সম্পাদকীয় মুখবন্ধে আমরা উল্লেখ পাই এ.সি.এন নাম্বিয়ারের, যিনি নেতাজির ঘনিষ্ঠ সহচর ছিলেন। তাঁর কথায়, নেতাজি ছিলেন “এক চিন্তার মানুষ…শুধুমাত্র ভারতের স্বাধীনতার”। তবে নাম্বিয়ার এও যোগ করেন, “আমার মতে এর একমাত্র ব্যতিক্রম, যদি একে ব্যতিক্রম বলা যায়, ছিল মিস শেঙ্কেল-এর প্রতি তাঁর ভালোবাসা, তাছাড়া তিনি পুরোপুরি নিবেদিত ছিলেন… তবে মিস শেঙ্কেল-এর প্রতি তাঁর প্রেম ছিল অতি গভীর…”

ভিয়েনায় এমিলি এবং অনিতা, নভেম্বর ১৯৪৮

বইটিতে দেওয়া প্রথম চিঠির তারিখ ৩০ নভেম্বর, ১৯৩৪, যাতে তাঁর রোমযাত্রার পথে আবহাওয়া এবং নৈসর্গিক দৃশ্যের বর্ণনা করে এমিলিকে সুভাষ লিখছেন, “ভারতে পৌঁছনোর আগে আর হয়তো চিঠি লিখতে পারব না… পত্রলেখক হিসেবে আমি খারাপ হলেও মানুষ হিসেবে নই, আশা করি।” চিঠির শেষদিকে তিনি লেখেন, “এই চিঠি এয়ারমেল মারফত পাঠাচ্ছি। কাউকে বোলো না যেন যে তোমায় এয়ারমেলে চিঠি দিয়েছি, কারণ আর কাউকে তো এয়ারমেলে চিঠি লিখছি না, তাদের খারাপ লাগতে পারে।” বেশ বোঝা যায়, এমিলির সঙ্গে যোগাযোগ রাখা তাঁর কাছে কতটা জরুরি ছিল, যদিও তখন পর্যন্ত এমিলিকে ‘মিস শেঙ্কেল’ বলেই সম্বোধন করছেন সুভাষ।

তাঁর আশঙ্কা সত্ত্বেও কিন্তু ভারতে পৌঁছনোর আগে আরও বেশ কয়েকটি চিঠি লিখতে পেরেছিলেন সুভাষ, যেগুলির মধ্যে ছিল ভেনিস, অ্যাথেন্স, এবং কায়রো থেকে লেখা ছোটো ছোটো চিঠি, যা পড়লে দেখা যায়, নিজের যাত্রার প্রায় প্রতিটি পর্ব এমিলিকে জানাচ্ছেন নেতাজি, ঠিক যেমন বাড়ির লোককে জানাই আমরা। কলকাতায় ফিরে উডবার্ন পার্কের বাড়ি থেকে ৭ ডিসেম্বর, ১৯৩৪ সালে তিনি ‘ফ্রলাইন শেঙ্কেল’-কে জানান তাঁর পিতা জানকীনাথের মৃত্যুর কথা, তাঁর মায়ের গভীর শোকের কথা। উল্লেখ্য, এই চিঠিতে তিনি আশঙ্কা প্রকাশ করেন যে আর কোনোদিনই হয়তো এমিলিকে তিনি চিঠি লিখতে পারবেন না, যেহেতু তিনি ব্রিটিশ সরকারের গৃহবন্দি। “যদি না পারি, আমাকে দয়া করে ভুল বুঝো না। বর্তমানে আমি নিজেদের বাড়িতেই বন্দি হয়ে রয়েছি,” লেখেন তিনি।

‘এমিলি অ্যান্ড সুভাষ, আ ট্রু লাভ স্টোরি’ বইটিতে শিশির বসুর স্ত্রী কৃষ্ণা বসু লেখেন, “আমাদের আত্মীয় বন্ধুদের মধ্যে যাঁরা অনিতাকে অন্তর থেকে স্বাগত জানান, তাঁদের মধ্যে আমি বলতে চাই প্রয়াত দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জন দাসের স্ত্রী বাসন্তী দেবীর কথা… ঠাকুমা (আমরা তাঁকে এই সম্বোধনই করতাম) আমাকে একবার বলেছিলেন যে ১৯৩০-এর দশকের শেষের দিকে সুভাষ ইউরোপ থেকে ভারতে ফেরার পর ঠাকুমা তাঁকে প্রশ্ন করেন, ‘তোমার যেন ভিয়েনা শহরটা একটু বেশিই পছন্দের, সেখানে বিশেষ কেউ আছে নাকি?’ এবং অবাক হয়ে দেখেন, লাল হয়ে আমতা আমতা করে না বলছেন সুভাষ। আমি নিজে যখন একবার ভিয়েনা যাই, আন্টি এমিলি এই ঘটনার কথা না জেনেই আমাকে বলেছিলেন, নেতাজি একবার তাঁকে বলেন বাসন্তী দেবীর সন্দেহের কথা।”

এমিলিকে লেখা সুভাষচন্দ্রের চিঠি 

বইটির আরও এক জায়গায় কৃষ্ণা দেবী লিখছেন, “পরদিন সকালে আন্টি আমাকে একটি ভাঁজ করা কাগজ দিয়ে বলেন, ‘কৃষ্ণা, এটা তোমার জন্য, আমার তরফ থেকে’। কিঞ্চিৎ জীর্ণ সেই কাগজ দেখে আমি কিছুটা অবাক হয়েই জিজ্ঞেস করি, ‘কী এটা’? আন্টি বলেন, ‘এটা একটা প্রেমপত্র’। সত্যিই বড় সুন্দর প্রেমপত্র ছিল সেটি, পড়ে মুগ্ধ হয়ে গিয়েছিলাম। চিঠিতে তারিখ ছিল না, তবে খামে পোস্টমার্ক ছিল ৫ মার্চ, ১৯৩৬ সালের। সুভাষ এমিলিকে লিখেছিলেন, ‘আমি জানি না আমার ভবিষ্যৎ কী। হয়তো সারাজীবন জেলখানায় কাটাব, বা হয়তো আমাকে গুলি করা বা ফাঁসি দেওয়া হবে।’ তারপর তিনি লেখেন, ‘তোমাকে হয়তো আর দেখতে পাব না – হয়তো ফিরে গিয়ে আর চিঠিও লিখতে পারব না – কিন্তু বিশ্বাস করো, তুমি সর্বদা বেঁচে থাকবে আমার হৃদয়ে, আমার চিন্তায়, আমার স্বপ্নে’।”

যাঁরা আগ্রহী, তাঁদের জ্ঞাতার্থে জানাই, এই লেখায় উল্লিখিত প্রত্যেকটি বই আজও সহজেই প্রাপ্ত, হয় দোকানে, নাহয় অনলাইন। বইগুলিতে যেসব চিঠির উল্লেখ রয়েছে, সেগুলি নেতাজির ব্যক্তিগত জীবনে সম্ভবত সবচেয়ে সযত্নে রক্ষিত গুপ্তকথার সাক্ষী, একটি এমন জগতের সাক্ষী যে জগতে হয়তো বাইরের ঝড়ঝাপটা মাত্রা ছাড়ালে আশ্রয় খুঁজতেন নেতাজি। কিন্তু এই আশ্রয় বেশিদিন ছিল না তাঁর, অচিরেই তা কেড়ে নেয় নিষ্ঠুর নিয়তি। নেতাজির স্ত্রী-কন্যার অস্তিত্ব নিয়ে যতই উত্তপ্ত বাদানুবাদে জড়াই আমরা, সাদাকালো সেইসব চিঠি বলে এক অপূর্ণ প্রেম, আকাঙ্ক্ষা, ও আনুগত্যের কাহিনি।

 

Developed by DXDasia