
বেঁচে থাকলে আজ সুচিত্রা ভট্টাচার্য ৭০ বছর পূর্ণ করতেন
‘কাছের মানুষ’ উপন্যাসে সাহিত্যিক সুচিত্রা ভট্টাচার্য লিখেছিলেন, “বুকের মধ্যে রাগ বিরক্তি দুঃখ জমাট বেঁধে গেলে মানুষ তা একা একা বয়ে বেড়াতে পারে, কিন্তু খুশির চাপ বড়ো অসহ্য। খুশিটাকে কারুর কাছে উজাড় করে না দিতে পারা পর্যন্ত কেমন যেন শান্তি হয় না।” আশ্চর্য এক বাস্তবে পাঠকদের নিয়ে চলে এলেন। এই অনিমেষ অবাধ্য যাতায়াতের সঙ্গী অসংখ্য মেয়ে। আপনি নিশ্চয় ইন্দ্রাণীকে চেনেন! ইন্দ্রাণী, কাছের মানুষের ইন্দ্রাণী। স্পষ্টবক্তা, দৃঢ়চেতা, বুদ্ধিমতী, সাহসী এক মহিলা। সেই সময় ‘কাছের মানুষ’ উপন্যাসের এই মূল চরিত্র ইন্দ্রাণীর মধ্যে মানুষ খুঁজে পেয়েছিলেন নিজেকে, নিজের সত্তাকে।

সুচিত্রা ভট্টাচার্যের অন্যতম জনপ্রিয় উপন্যাস দহন
আরও পড়ুন
“নারী ছলনাময়ী, জন্ম অভিনেত্রী, কিন্তু সে কি শুধু পুরুষজাতিকে মুগ্ধ করবার জন্যে?” – আশাপূর্ণা
চাপা দুঃখ, চাপা কষ্ট, চাপা উত্তেজনা সমস্তটার ব্যথা ইন্দ্রাণীরা বোঝে। আর তাই সুচিত্রা উপন্যাসের পাতা জুড়ে লিখে ফেলেন, “শোকের সঙ্গে সময়ের এক সূক্ষ্ম রেষারেষি আছে। তাদের মধ্যে এক চাপা লড়াই চলছে অবিরাম। এই দ্বৈরথের প্রথম দফায় শোকই জেতে, চকিত আঘাত হেনে সময়কে সে নিশ্চল করে দেয়। তারপর ধীরে ধীরে সময় বলবান হয়ে ওঠে, তার অদৃশ্য শরজালে হঠে যেতে থাকে শোক। ক্রমশ নির্জীব হয়ে পড়ে সে। তবে তাকে পুরোপুরি নিশ্চিহ্ন করার শক্তি বুঝি সময়েরও নেই। এক শীতল বিষণ্ণতা হয়ে সে টিকে থাকে বহুকাল। অনেকটা যেন মেরুপ্রভার মতো। ক্ষীণ দীপ্তি, অথচ কী তার অপার বিস্তার।”
নিজের লেখালেখি নিয়ে রঞ্জন বন্দ্যোপাধ্যায়ের সঙ্গে কথোপকথনে সুচিত্রা ভট্টাচার্য | সৌজন্যে- তারা নিউজ
মেয়েরা কি শুধুমাত্র বাড়িতেই বসে থাকবে? সমাজের স্বাধীন গর্জন কবে শোনা যাবে মেয়েদের মুখে? এখানেই বারবার আঘাত করে গেছেন সুচিত্রা ভট্টাচার্য। গড়ে তুলেছেন রক্তমাংসের অসংখ্য মহিলাদের। যারা প্রতিদিন জিতে যায় নিজের কাছে, আমার কাছে, আপনার কাছে। তারা অদম্য জেদি। হার মানতে নারাজ। তারা একরোখা। চাপা অহংকার আছে তাদের। কিন্তু সংসার আর সমাজের মায়াজালে নিজেদের আটকে না রেখে প্রত্যেকেই যে যার মতো করে উড়তে চায়। কখনও একা, কখনও প্রিয় মানুষটির সঙ্গে। সুচিত্রা তাই অনায়াসে বলে দিতে পারেন, “খুব আপন জিনিস না হারানো পর্যন্ত মানুষ তার মূল্য বুঝতে পারে না।”

বিংশ শতকের সাতের দশকের শেষের দিকে ছোটো গল্প ও আশির দশকের মধ্যভাগ থেকে উপন্যাস লিখতে শুরু করেন সুচিত্রা ভট্টাচার্য। সমকালীন সামাজিক ঘটনাগুলির ওপর ভিত্তি করে তাঁর কাহিনিগুলি রচিত হতে থেকেছে। শহুরে মধ্যবিত্তদের ব্যক্তিগত সম্পর্কের টানাপোড়েন, ক্রমশ পরিবর্তনশীল নীতিবোধ, বিশ্বায়নের প্রেক্ষাপটে নৈতিক অবক্ষয়, নারীদের দুঃখ-যন্ত্রণা তাঁর লেখার মূল উপজীব্য ছিল। সৃষ্টি করেছেন ‘মিতিন মাসি’ নামক এক মহিলা গোয়েন্দা চরিত্র। তাঁর ‘দহন’ উপন্যাসের উপর ভিত্তি করে ১৯৯৭ সালে চিত্র-পরিচালক ঋতুপর্ণ ঘোষ নির্মাণ করেন বাংলা চলচ্চিত্র। পরবর্তীকালে তাঁর উপন্যাস থেকে তৈরি হয়েছে ‘ইচ্ছে’, ‘অলীক সুখ’, ‘প্রাক্তন’ নামক কয়েকটি বাংলা চলচ্চিত্র।

সুচিত্রা ভট্টাচার্যের কাহিনি অবলম্বনে চলচ্চিত্রসমূহ
সুচিত্রার লেখার রেশ ধরেই বলতে ইচ্ছা হয়, “মন খারাপের মুহূর্তে হঠাৎ যদি কেউ হারিয়ে যাওয়া নাম ধরে ডেকে ওঠে, মনটা যেন লহমায় ভালো হয়ে যায়। সংসারের মালিন্য, বেঁচে থাকার জটিলতা, প্রাপ্তি-অপ্রাপ্তির হা-হুতাশ কিছুই যেন আর স্মরণে থাকে না। বুকের ভেতর ঘুমিয়ে আছে এক টাইম মেশিন, সোঁ সোঁ করে ছুটতে থাকে সে, হু হু করে কমে যায় বয়স।” বেঁচে থাকলে আজ সুচিত্রা ভট্টাচার্য ৭০ বছর পূর্ণ করতেন।
