বিশ্ব পরিবেশ দিবস : কোচবিহারে ১০০টি ছাদে ভেষজ বাগান তৈরির উদ্যোগ

ভেষজ বাগানের অন্যতম উদ্যোক্তা আয়ুর্বেদিক অফিসার ডাঃ বাসবকান্তি দিন্দা

আয়ুর্বেদ চিকিৎসার ইতিহাস বহু প্রাচীন। ভারতবর্ষে প্রায় পাঁচ হাজার খ্রিস্ট পূর্বাব্দ থেকে ঔষধি গুণযুক্ত ভেষজ গাছের ব্যবহার চলে আসছে আয়ুর্বেদের হাত ধরে। ‘আয়ু’ শব্দের অর্থ ‘জীবন’ এবং ‘বেদ’ অর্থে ‘জ্ঞান’ বা ‘বিদ্যা’। অর্থাৎ জীবনজ্ঞান বা জীববিদ্যা। কিন্তু বর্তমানে ভেষজ উদ্ভিদকে টিকিয়ে রাখার সচেতনতার অভাব লক্ষ্য করা যায় চারিদিকে। অনেক ভেষজ গাছ আজ তাই হারিয়ে যাচ্ছে। ঠিক এমন পরিস্থিতিতে বিশ্ব পরিবেশ দিবসে কোচবিহারে প্রায় একশোটি ইচ্ছুক ব্যক্তির ছাদের উপর ‘ভেষজ বাগান’ তৈরির পরিকল্পনা গ্রহণ করা হয়েছে।

আজ বিশ্ব পরিবেশ দিবসে প্রায় সকলেরই উচিত সবুজায়নের দিকে নজর দেওয়া। গতবছর লকডাউনে মানুষ গৃহবন্দি থাকলেও প্রকৃতি তার শাখা-প্রশাখা নিয়ে আনন্দে মেতে উঠেছিল। দূষণের মাত্রা কমে যাওয়ায় গাছপালা, পাখি, জন্তুরা ফিরে পেয়েছিল নিজেদের সাম্রাজ্য। তাই একমাত্র মানুষই পারে পৃথিবীকে আরও সবুজ করে তুলতে। চাইলে যে কেউ বাড়িতেই ভেষজ গাছ লাগাতে পারি। কারণ এসব গাছ যে কতরকম সেবায় ব্যবহৃত হয়, তা আশা করি সকলেরই জানা। বিজ্ঞানভিত্তিক ভেষজ গাছই হতে পারে রোগ নিরাময়ের অন্যতম উপায়। কোচবিহার জেলার নাটাবাড়ি-২ গ্রাম পঞ্চায়েতের ভেষজ ভাণ্ডার ছাদে ‘ভেষজ বাগান’ করার পরিকল্পনা গ্রহণ করা হয়েছে। এমনকি কোচবিহার জেলাজুড়ে প্রায় ১০০টি ইচ্ছুক ব্যক্তির বাড়ির ছাদে তৈরি করা হবে ভেষজ বাগান।স্বাস্থ্য সুরক্ষার কথা মাথায় রেখে বাড়ির ছাদে বা উঠোনে অনায়াসে লাগানো যেতে পারে ব্রাহ্মী, ভৃঙ্গরাজ, তুলসী, কুলেখাড়া, আয়াপ্পান, মধু, তুলসী ইত্যাদি HERBS জাতীয় হালকা ভেষজ গাছ। কারণ এই গাছগুলি সারা বছর থাকে এবং সহজে বংশ বিস্তার করে। চাষে পরিশ্রম ও খরচ কম। এখনকার তরুণ প্রজন্মকে গাছগুলো চেনানো, তাকে সংরক্ষণ ও নিয়ন্ত্রণ করা খুব প্রয়োজন।ছাদে তৈরি বাগানে থাকবে ১৪টি ভিন্ন ভিন্ন ভেষজ উদ্ভিদ। এছাড়া আজই এক কেজি জৈব সার, ভেষজ বাগান ও ব্যবহারের সহায়ক পুস্তিকা পৌঁছে দেওয়া হবে বাড়িতে বাড়িতে। পৌঁছে দেবেন তুফানগঞ্জ ১ ব্লকের নাটাবাড়ি- ২ ভেষজ ভাণ্ডারের স্বয়ম্ভর গোষ্ঠীর মহিলারা। সবমিলিয়ে মূল্য মোট ২০০ টাকা। নাটাবাড়ি ব্লক প্রাথমিক স্বাস্থ্যকেন্দ্রের সিনিয়ার আয়ুর্বেদিক অফিসার ডাঃ বাসবকান্তি দিন্দা এই গুরুত্বপূর্ণ উদ্যোগ প্রসঙ্গে বঙ্গদর্শনকে জানিয়েছেন, “২০১৯ সালের ডিসেম্বর মাস থেকে কোচবিহার শহরে আমরা ছাদের উপর ভেষজ বাগান শুরু করি ‘ভেষজ সুরক্ষা’ প্রকল্পের মাধ্যমে।  এখন এই বাগানের সংখ্যা অনেক বেড়েছে। বাগানের ভেষজকে খাদ্য ও ওষুধ হিসাবে ব্যবহার করে এখন অনেকেই উপকৃত। সম্প্রতি রাজবাড়ি পার্কে স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ দপ্তরের ‘আয়ুষ বিভাগ’ ও নাটাবাড়ি-২ ভেষজ ভাণ্ডারের উদ্যোগে একটা  সচেতনতামূলক সভা ও ভেষজ চারা বিতরণের কাজ করি আমরা।”কোচবিহার শহরকে সবুজ ও সুস্থ রাখতে গ্রামীণ মহিলাদের স্বনির্ভরতায় সহযোগিতার জন্যও সকলকে আহ্বান জানানো হয়েছে। বাসবকান্তি দিন্দা আরও বলেন, “আজ বিশ্ব পরিবেশ দিবস উপলক্ষ্যে বিকেল ৪টেয় গুগুল মিটে একটি ভার্চুয়াল সভা করব আমরা। উপস্থিত থাকবেন শহরের আয়ুর্বেদিক ডাক্তার, কৃষি বিশেষজ্ঞ, বনবিভাগের অধিকারিক, শিক্ষক, সমাজসেবী ও অন্যান্য বিশিষ্ট ব্যক্তিবর্গ।”সাধারণত ফুল গাছ বেশিদিন থাকে না। সেই ফাঁকা টবে ভেষজ চারা লাগানো যেতে পারে, যে গাছ মরবে না আবার শরীরের জন্যও ভালো। বাসবকান্তিবাবুদের প্রচারে সাড়া দিচ্ছেন কোচবিহারের অসংখ্য মানুষ। মধু, তুলসী, আয়াপ্পান, ভৃঙ্গরাজ, ব্রাহ্মী, কুলেখাড়া, কালমেঘ, কারিপাতা, পাথরকুচি, অ্যালোভেরা, গুলঞ্চ, পুদিনা, নয়নতারা, বাসক — চাইলে বাড়িতে যে কেউ লাগাতে পারেন। ছোটোদেরও উদ্বুদ্ধ করতে হবে। কারণ সবুজের আগামী ভবিষ্যৎ ছোটোদের হাতেই।

ছাদের উপর ভেষজ বাগান করে উপকৃত হয়েছেন স্বাস্থ্যকর্মী থেকে গৃহবধূ, শিক্ষক থেকে পুলিশ অনেকেই। উপকৃতদের একটা তালিকা দিয়েছেন বাসবকান্তি দিন্দা নিজেই। কুয়ারপাড় এলাকার গৃহবধূ গায়ত্রী রায় জানাচ্ছেন, বাগানের কুলেখাড়ার রস খাইয়ে মেয়ের রক্তাল্পতায় উপকার পেয়েছেন তিনি। অন্যদিকে বাবুরহাটের স্বাস্থ্যকর্মী কল্পনা দেবনাথ বলছেন, বাগানের ব্রাহ্মিকে শাক হিসেবে ব্যবহার করে অনিদ্রাতে উপকার পেয়েছেন।

আজ বিশ্ব পরিবেশ দিবসে বাসবকান্তিবাবুদের মতো এমন উদ্যোগ ছড়িয়ে পড়ুক প্রতিটা ঘরে ঘরে। গাছ হোক প্রাণের উৎসব আর উৎসবের রং হয়ে উঠুক সবুজে সবুজ।

ছবি সৌজন্যেঃ ডাঃ বাসবকান্তি দিন্দা

 

Developed by DXDasia