পাহাড়ের নির্জন স্বর্গ রিশ্যপ

এখান থেকে চোখের সামনে দেখা যায় হিমালয়

মানুষ যে কয়েকটা কারণের জন্য ঘর ছেড়ে বেরিয়ে পড়ে; ‘নির্জনতার খোঁজ’ তার মধ্যে অন্যতম। ব্যস্ত শহুরে জীবনের একঘেয়ে ক্লান্তি থেকে দূরে, বহু দূরে হারিয়ে যাওয়ার উদ্দেশ্য মানুষকে বিবাগি করে তোলে। ঘরছাড়া করে।

কুয়াশায় ঘেরা জনপদ 

সেই রকম কয়েকটা নির্জন জায়গার মধ্যে রিশ্যপ আমার ভীষণ প্রিয়। পশ্চিমবঙ্গের কালিম্পং জেলার অন্তর্গত ছোট্ট পাহাড়ি জায়গা। সমুদ্রতল থেকে এর উচ্চতা ৮৫০০ ফিট। একে গ্রাম বললে ভুল হবে, কারণ এখানে কোনও জনবসতি নেই। শুধু এক নৈসর্গিক শান্তি বাস করে এখানে। ‘রি’ কথাটার মানে ‘পর্বতচূড়া’ আর ‘শ্যপ’ মানে ‘তিব্বতের পুরোনো গাছ’। রিশ্যপ খুব বেশি পর্যটকদের মধ্যে প্রিয় হয়ে ওঠেনি। ১৯৯৮ থেকে একে একটি পর্যটন কেন্দ্র বলে গণ্য করা হয়। চারিদিকে পাহাড় ঘেরা – তার মাঝে সবুজ উপত্যকা – এইটুকুই রিশ্যপ।

আমাদের হোটেলটার নাম– ‘নেওড়া ভ্যালি রিসর্ট’। সবুজ ত্রিভুজাকৃতি মাথার ছাদ। আর প্রতিটা ঘর ছোটো-ছোটো আলাদা আলাদা ‘কটেজ’। কলকাতা থেকে আমাদের বুক করা ছিল। সেই মতো বাগডোগরা বিমানবন্দর থেকে হোটেলের গাড়ি এসে আমাদের তুলে নিল। হুড খোলা জিপ গাড়ি। এই রাস্তায় জিপ গাড়ি ছাড়া আর কোনও গাড়ি চলে না। ধুলোমাখা পথ ছেড়ে গাড়ি যখন ভিতরে ঢুকছে, তখন ঘড়িতে দুপুর একটা। বাগডোগরা থেকে রিশ্যপ প্রায় ৩ ঘণ্টার পথ। রাস্তার দু’ধারে ঘন দেবদারু জঙ্গল। তা ছাড়িয়ে একটু এগিয়েই মিলিটারি ব্যারাকস। এর পরই শুরু হল – সবুজ চা-বাগান পথের দু’পাশে। বাঁ দিকে দার্জিলিঙের রাস্তা ছেড়ে আমরা আরও সোজা উপরে উঠতে লাগলাম – উত্তরে। রাস্তায় গাড়ি থামিয়ে আমরা কিছু খাবার কিনলাম। আস্তে আস্তে ঠান্ডা বাড়তে লাগল। সময়টা ডিসেম্বর। আর তাই আরও ঠান্ডা। সাথে কনকনে উত্তরে হাওয়া। আমাদের সঙ্গের চালকটি ভারি ভালো – অমায়িক। নাম চুঙচুঙ ভুটিয়া। ওর বাড়ি কালিম্পঙে লাভা শহরে। ও যাওয়ার পথেই দেখাল অনেকগুলো ঝর্না। সবুজ পাহাড়ের গা ঘেঁষে নেমে এসেছে নিচে। দূর থেকে যখন রিশ্যপ দেখলাম, তখন ঘড়িতে ৫টা। এখানে আস্তে আস্তে সবুজ শেষ হয়ে এসেছে। আলগা সাদা পাথরের রাস্তা। পাহাড় কেটে বানানো। কোনও পাকা রাস্তা নেই। প্রায় ৪ কিমি পথ এ রকম পাথরের উপর দিয়ে গাড়ি চলল দুলতে দুলতে।

হিমালয়ের আহ্বান 

হোটেলে যখন পৌঁছুলাম – তখন সূর্য ডুবে গেছে। একেই শীতকাল – বেলা ছোটো আর তার উপর পূর্বের পাহাড়। তাই খুব তাড়াতাড়ি অন্ধকার নেমে এল পাহাড়ের কোলে। এখানে ইলেকট্রিকের ব্যবস্থা জোরালো নয়। ছোট্ট ছোট্ট টিমটিম করে জ্বলছে সাদা আলো ঘরের ভিতর। প্রতিটা কটেজ একে অপরের থেকে অনেকটা দূরে। মাঝে পাথুরে রাস্তা আর সবুজ ছোটো ছোটো গাছের ঝাড়। নানান বাহারি ফুল। প্রতিটা ঘরের সাথে লাগোয়া বারান্দা। সেখানে দু’টো বেতের চেয়ার। কাঠের ঘর। আসবাবপত্র কাঠের। একটা ছোটো জানলা। ঘরের দরজাটা ছোটো। মাথা নিচু করে ঢুকতে হয় ভিতরে। ঘরের ভিতর ‘রুম হিটার’ ছাড়া থাকা যায় না। সোয়েটার-জ্যাকেট সমস্ত কিছু চাপিয়েও শীতে একেবারে কাবু হয়ে যাচ্ছিলাম।

মোহময়ী প্রকৃতি
 

পরের দিন যখন ঘুম ভাঙল; তখন ভোর পাঁচটা। আমরা বেরোলাম টিফিন দাঁড়ার উদ্দেশ্যে। ঘন জঙ্গলের ভিতর দিয়ে – ভেজা পাতার উপর দিয়ে পায়ে হেঁটে যেতে হয় ১ কিমি। এখান থেকে সূর্যোদয় দেখা যায়। পরিষ্কার সাদা তুষারে ঢাকা কাঞ্চনজঙ্ঘা চোখের সামনে। সূর্যের আলো ঠিকরে পড়ছে তার উপর – ঠিক যেন হীরের মত। সেখান থেকে নেমে আমরা আরও হেঁটে গেলাম নিচের দিকে। এখানে রাস্তাটা দু’টো ভাগ হয়ে গেছে – একটা গেছে লাভা হয়ে কালিম্পং মূল শহরে আর আরেকটা গেছে লোলেগাঁওয়ের উদ্দেশ্যে। সমস্ত বাজারের জন্য লাভা বা কালিম্পং-ই যেতে হয়। যাওয়া-আসার পথে একজন পর্যটকও চোখে পড়ল না। রিশ্যপের বৈশিষ্ট্য ওর প্রাকৃতিক সৌন্দর্য। এই সৌন্দর্যটুকুই শুধু নীরবে উপভোগ করতে হয়। চোখের সামনে তুষাররাজ হিমালয় – চারিদিকে সবুজ বনানী – সাদা খোয়ায় ভরা রাস্তা – রঙিন ফুলের ঝাড় – আর ফুলে ফুলে বাহারি প্রজাপতি – সব মিলিয়ে এ যেন এক স্বর্গরাজ্য। আমরা গাড়ি করে গেলাম একটা ঝর্না দেখতে একটু দূরে। সেটা দেখে ফিরতে ফিরতে সন্ধে হল। রোদ পালিয়ে বিকেল নামল। চারিদিকে কুয়াশার চাদর নেমে আসছিল ধীরে ধীরে। পাহাড়ের চূড়োয় – গাছের মাথায়। বারান্দায় বসে চা-খেতে খেতে দেখছিলাম কাঞ্চনজঙ্ঘা কীভাবে রং বদলাচ্ছিল। আসলে হিমালয়ের সৌন্দর্য বাকি পাহাড়ের মত নয়। খুব স্নিগ্ধ –  সজীব। আর তাই হয়তো এই কারণেই হিমালয়ের টান অমোঘ। বারে বারে ফিরে আসতেই হয় ওর কাছে।

পর্যটকের স্বর্গরাজ্য 

হোটেল থেকে ‘বনফায়ারের’ ব্যবস্থা করেছিল। আমরা গোল হয়ে ঘিরে বসেছিলাম আগুনকে। প্রায় তিন ঘণ্টা ধরে চলল জংলি মুর্গি রোস্ট। কাঠের আগুন প্রায়ই নিবে আসছিল। মাঝে মাঝে কাঠ জ্বেলে দিতে হচ্ছিল। কখন দেখি একটা লোমশ পাহাড়ি কুকুর – লাসা প্রজাতির বোধ হয় – জুটেছিল পাশে এই শীতের রাতে আমাদের বন্ধু হিসেবে। গুটি শুটি হয়ে কুণ্ডলী পাকিয়ে বসেছিল আগুনের পাশে। রাত যখন ৯টা– আগুন তখন নিবু-নিবু। মাথার উপরে পূর্ণিমার উজ্জ্বল চাঁদ। আর অগণিত তারা। সেই তারায় ভরা আকাশের নিচে বসেছিলাম অনেকক্ষণ। ঠান্ডা বাড়ছিল ক্রমশ। এরপর উঠে পড়লাম আমরা। কাল ভোরে চলে যাব কালিম্পং। কিন্তু এই একটা রাতের অসামান্য সুন্দর স্মৃতি মনে থাকবে বহুকাল।

সুন্দরী রিশ্যপ 

“ফিরব” বললেই ফেরা যায় নাকি, জানি না। কিন্তু ব্যস্ত শহুরে দূষণের মধ্যে হাঁপিয়ে পড়া প্রাণ যখনই একটু অক্সিজেন খুঁজে ফিরবে, হয়তো এই ছোট্ট স্মৃতি ‘দু’দণ্ড’ শান্তি আনবে মনের ভিতর।
 

কীভাবে যাবেন
নিউ জলপাইগুড়ি রেল স্টেশন বা বাগডোগরা বিমানবন্দর থেকে ট্যাক্সিতে রিশ্যপ যাওয়া যায়। তবে হোটেল থেকে গাড়ির ব্যবস্থা করাই ভালো। এছাড়া লাভা, কালিম্পং বা লোলেগাঁও থেকেও যাওয়া যায় রিশ্যপ, জিপ গাড়ি ভাড়া করে।
নিউ জলপাইগুড়ি থেকে রিশ্যপ : ৫২ কিমি
কালিম্পং থেকে রিশ্যপ : ৩১ কিমি
লাভা থেকে রিশ্যপ : ৬ কিমি
লোলেগাঁও থেকে রিশ্যপ : ৪৩ কিমি
কোথায় থাকবেন
পর্যটকদের জন্য রিশ্যপে কিছু হোটেল এবং রিসর্ট রয়েছে। তার মধ্যে কয়েকটির ফোন নম্বর দেওয়া হল –
নেওড়া ভ্যালি রিসর্ট, যোগাযোগ – ৯০৩৮০৫৫৫৩০, ৯৩৩১৬১০৬৯৪।
রিশ্যপ নেচার কটেজ, যোগাযোগ – ৯৮৩০২৫২৮৪৩।
হিমালয়ান হাট, যোগাযোগ – ৯০০৭১৮১৫৮৪।
সতর্কতা
প্রয়োজন মতো ঠান্ডার জামা-কাপড়ের ব্যবস্থা রাখতে হবে। রুমহিটারের বন্দোবস্ত আগে থেকে করে রাখতে হবে হোটেলের সাথে কথা বলে। প্রয়োজন মতো ওষুধ সাথে রাখা দরকার। যাঁদের শ্বাসের সমস্যা আছে; তাঁরা আগে থেকে প্রয়োজনীয় ওষুধ ও সরঞ্জাম নিয়ে যাবেন।

 

 

রিশ্যপের অবস্থান 

Developed by DXDasia