
বুদ্ধদেব ভট্টাচার্য ছিলেন বাংলার সপ্তম মুখ্যমন্ত্রী
১৯৪৪-এর ১ মার্চ জন্ম। মানুষটা সুপুরুষ, ছোটখাটো এবং চেইন স্মোকার। গত শতাব্দীর ছয়ের দশকের শুরুতে বাংলার উত্তপ্ত রাজনৈতিক পরিস্থিতির মধ্যে সিপিআইএমে যোগদান। তখন সিপিআইএমও সদ্যজাত। শৈলেন্দ্র সরকার বিদ্যালয় এবং প্রেসিডেন্সির সদ্য প্রাক্তনী, সুবক্তা, তাত্ত্বিক ছাত্রটির নেতা হয়ে উঠতে বেশি সময় লাগেনি। সঙ্গে পেয়েছেন বিমান বসু, শ্যামল চক্রবর্তীদের। উত্তাল বাংলায় তখন লাগাতার আন্দোলন! একদিকে খাদ্য আন্দোলন, অন্যদিকে ভিয়েতনামকে গ্রাস করতে উদ্যত, বুভুক্ষু মার্কিন সাম্রাজ্যবাদের বিরোধে সংগঠিত আন্দোলনের অন্যতম মুখ হয়ে উঠলেন বুদ্ধদেব ভট্টাচার্য। এরপর শুধুই উত্থান। পার্টির রাজ্য কমিটিতে জায়গা, গণতান্ত্রিক যুব ফেডারেশনের রাজ্য সভাপতি। তারপর আসে ৭৭-এর নতুন লাল জমানা। প্রথমবার কাশীপুর থেকে বিধানসভায় জিতে বুদ্ধদেববাবু পশ্চিমবঙ্গের তথ্য ও জনসংযোগ মন্ত্রী হন। ১৯৮২-তে অবশ্য কাশীপুর থেকে হেরে যান আবার ১৯৮৭ থেকে ২০১১ পর্যন্ত তিনি যাদবপুর থেকে জিতে নানান দপ্তর সামলান। তারমধ্যে উল্লেখযোগ্য তথ্য ও সংস্কৃতি দপ্তর, স্বরাষ্ট্র দপ্তর। এরপর উপমুখ্যমন্ত্রী হওয়া। সবশেষে, বাংলার সপ্তম মুখ্যমন্ত্রী হন বুদ্ধবাবু।
সমস্ত অবিচুয়ারিতেই, চলে যাওয়া বিখ্যাত মানুষটির কাজের হিসাব এইভাবেই রাখতে হয়। তবে কিছু মানুষের জন্য এরপরও অন্যভাবে আরও একটু লিখতে হয়—
বুদ্ধদেব ভট্টাচার্য (Buddhadeb Bhattacharjee) কোথাও গিয়ে নিজেকে এবং নিজের মতাদর্শকে ভাঙতে চেয়েছেন বারবার। নয়ের দশকের শুরুতে জ্যোতিবাবুর মন্ত্রীসভা থেকে বেরিয়ে গিয়ে, ওই দশকের মাঝামাঝি আবার ক্যাবিনেট-এর দ্বিতীয় শক্তিশালী মুখ হয়ে ফিরে আসা। কৃষির পাশে শিল্পেরও যে প্রয়োজন সেটা যিনি আক্ষরিকভাবে প্রথম বুঝলেন, তিনি বুদ্ধদেব ভট্টাচার্য। বামপন্থী হয়েও আজিম প্রেমজির মতো শিল্পপতির কাছ থেকে পেলেন দেশের দক্ষ মুখ্যমন্ত্রীর তকমা। তাঁর হাত ধরে আইটি ক্ষেত্রে ২০০১-২০০৬ সময়কালে যে উন্নতির সূচনা রাজ্যে হয়েছিল, সেই ধারা এখনও অব্যাহত। সিঙ্গুর-নন্দীগ্রাম – ঠিকভুলের বাইরেও যে বুদ্ধদেব ভট্টাচার্যকে লোকে চেনে, তিনি হয়তো যুবসমাজকে কাজ দিতে চেয়েছিলেন। যদিও সেখানেও উঠেছে প্রশ্ন, তৈরি হয়েছে বিতর্ক।
আরও পড়ুন: কিছু প্রত্যাখ্যান বাংলাকে সমৃদ্ধ করে…
ট্রেড ইউনিয়ন না করা, মার্জিত, শিক্ষিত, সাহিত্যপ্রেমী ভদ্রলোক ছিল বুদ্ধবাবুর ব্র্যান্ড ইমেজ। কবি সুকান্ত ভট্টাচার্যের ভ্রাতুষ্পুত্র, অসাধারণ বাচিক শিল্পী, রবীন্দ্রানুরাগী, অসামান্য অনুবাদক বুদ্ধবাবু হয়তো কোনওদিনই ভালো শাসক হতে পারেননি। শিক্ষিত বাঙালি ভদ্রলোক হয়ে থেকে গেছেন। যাঁর বুকে শুধু জমা হয়েছে নিকোটিন এবং অনেক কিছু না বোঝাতে পারার যন্ত্রণা। কৃষ্ণচন্দ্র স্মৃতিতীর্থের উত্তরসূরি বুদ্ধদেব, সাম্প্রদায়িক শক্তির বিরুদ্ধে ছিলেন অবিচল ঔদ্ধত্যের চিহ্ন। শেষ দিন অবধি পাম এভিনিউর ছোট্ট ফ্ল্যাটে থাকা মানুষটিকে মনে থাকবে সব প্রজন্মের বঙ্গ রাজনীতির।
বুদ্ধ ভট্টাচার্য না থাকলে হয়তো লাতিন আমেরিকার সাহিত্য নিয়ে ন্যূনতম ধারণা তৈরি হত না আমাদের। ফ্রানজ বুদ্ধবাবুর করা মেটামরফোসিসের বাংলা অনুবাদ ‘পোকা’ আর লোরকার অনুবাদিত কবিতা পড়েই ফ্রানজ কাফকা আর ফ্রেদেরিকো গার্সিয়া লোরকার সাহিত্যের সঙ্গে অনেক বঙ্গবাসীর প্রথম পরিচয়। পিডিজির (প্রমোদ দাশগুপ্ত) চিন ভ্রমণের ছায়াসঙ্গী, বাংলার প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী বুদ্ধদেব ভট্টাচার্য চলে গেলেন। শেষ হলো বাংলা তথা ভারতের কমিউনিস্ট রাজনীতির একটি অধ্যায়। কমিউনিস্টরা কি স্বর্গ পায়, কমরেড? কে জানে…
____
প্রয়াত বুদ্ধদেব ভট্টাচার্য
Obituary of Buddhadeb Bhattacharjee
