পর্যটন বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে প্লাস্টিককে ‘না’ বলছে লামাহাট্টা

স্থানীয় মানুষ এবং পশ্চিমবঙ্গ সরকারের যৌথ উদ্যোগে গড়ে উঠেছে ইকো-ট্যুরিজম পার্ক

২০১২ সালের আগে কেউ লামাহাট্টাকে চিনত না। সেই বছর ছোট্ট গ্রামটির রাস্তা দিয়ে যাচ্ছিলেন রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। প্রকৃতির অসাধারণ সৌন্দর্য তাঁর মন কেড়ে নেয়। গাড়ি থামিয়ে ছবি তুলতে থাকেন। বুঝতে পারেন, পর্যটনকেন্দ্র হয়ে ওঠার সম্ভাবনা রয়েছে এই জায়গায়। তাঁর নির্দেশে কাজ শুরু করে দেয় প্রশাসন। ভ্রমণার্থীদের জন্য আকর্ষণীয় গন্তব্য হিসেবে লামাহাট্টাকে গড়ে তোলার পাশাপাশি একটি ইকো-ট্যুরিজম পার্কও নির্মাণ করা হয়।

লামাহাট্টা ইকো-পার্ক

সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে প্রায় ৫৭০০ ফুট উঁচুতে পূর্ব হিমালয়ের কোলে শান্ত নিরিবিলি গ্রাম লামাহাট্টা। দার্জিলিং থেকে দূরত্ব ২৩ কিলোমিটার। পাইন এবং ওক গাছে ভরা এই গ্রামে সব সময় বিরাজ করে নিরবিচ্ছিন্ন এক নিস্তব্ধতা। মানুষের দেখা মেলে খুবই কম।  

লামাহাট্টায় ক্রমশ পর্যটকের সংখ্যা বাড়ছে। হোমস্টে গজিয়ে উঠছে একের পর এক। গ্রামের সমৃদ্ধি বাড়ছে। কিন্তু যত বেশি মানুষ আসছেন, ততই বেড়ে চলেছে আবর্জনা। বিশেষ করে অপচনযোগ্য বর্জ্য। পর্যটকদের থেকে স্থানীয় বাসিন্দারা যেমন উপার্জন করতে পারছেন, তেমনি ফেলে দেওয়া প্লাস্টিকের বোতল, খালি প্লাস্টিকের প্যাকেট এবং আরও নানা জঞ্জালে ভরে উঠছে লামাহাট্টা। প্রকৃতির আদিম সৌন্দর্য কীভাবে নষ্ট হচ্ছে, তা নিয়ে বহু লোকেরই কোনো ভ্রুক্ষেপ নেই।

মাননীয়া মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় লামাহাট্টায় খতিয়ে দেখছেন ইকোপার্কের প্ল্যান 

মুশকিল আসান করতে অবশেষে শুরু হয়েছে ‘স্বচ্ছ লামাহাট্টা অভিযান’। গড়ে তোলা হয় নতুন এক কমিটি। সভাপতি রাজকুমার প্রধান নিজেও একটি হোমস্টে-র স্বত্বাধিকারী। “আমরা বুঝতে পেরেছিলাম, আমাদের এলাকায় আবর্জনা ফেলা বন্ধ করতেই হবে। প্রথম পদক্ষেপ ছিল প্লাস্টিকের ব্যবহার সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ করা,” জানালেন রাজকুমার। 

আজও লামাহাট্টার বাসিন্দারা প্রধানত কৃষিকাজ এবং পশুপালনের ওপর নির্ভরশীল। তবে দার্জিলিং-কালিম্পং হাইওয়ের সাহায্যে পর্যটকরাও সহজে পৌঁছে যেতে পারেন। শেরপা, ভুটিয়া, তামাং, ইয়ালমো এবং দুকপা জনগোষ্ঠীর বাস এই গ্রামে। ‘লামাহাট্টা’ শব্দের অর্থ ‘লামার আশ্রম’। স্থানীয় মানুষ এবং পশ্চিমবঙ্গ সরকারের বন দপ্তরের যৌথ উদ্যোগে তৈরি হয়েছে ইকো-ট্যুরিজম পার্ক। এলাকার জীববৈচিত্র্য দারুণভাবে সংরক্ষিত এবং প্রদর্শিত হয়েছে সেখানে। আকাশ পরিষ্কার থাকলে আপনি পার্ক থেকেই দেখতে পাবেন দার্জিলিং শহর, টাইগার হিল, রঙ্গিত নদী এবং পৃথিবীর তৃতীয় উচ্চতম শৃঙ্গ কাঞ্চনজঙ্ঘা। 

অপরূপ দৃশ্য উপভোগ করার সঙ্গে চলে আসে দায়িত্বও। যদি সেই দায়িত্ব আপনি ভুলে যান, আপনাকে ঠিক মনে করিয়ে দেবে স্বচ্ছ লামাহাট্টা অভিযান কমিটি। রাজকুমার বলেন, “সর্বত্র আমরা বিজ্ঞপ্তি লাগিয়ে রাখব। সরকারের কাছে আবেদন করব, যাতে আরও বেশি করে ডাস্টবিন বসানো হয়। মানুষ তাহলে বুঝতে পারবে, কোথায় নোংরা ফেলতে হবে।” কিন্তু স্থানীয় লোকেদের অনুরোধ যদি পর্যটকরা না শোনেন? “তাঁদের সামনেই আবর্জনা পরিষ্কার করব আমরা। আশা করব, লজ্জা পেয়ে তাঁরা আমাদের সহায়তা করবেন,” হেসে বলেন রাজকুমার। 

লামাহাট্টাকে পরিষ্কার রাখার অভিযানে এলাকার সাধারণ বাসিন্দারাও সামিল হয়েছেন। ফেলে দেওয়া প্লাস্টিক, মোড়ক, প্যাকেট ইত্যাদি সংগ্রহ করে তাঁরা ব্যাগে জমা করেন। সোনাদার এক স্বেচ্ছাসেবী সংস্থা পুনর্ব্যবহারের জন্য নিয়ে যায় সেগুলি। রাজকুমারের কথায়, “আমি নিজে বাড়ি বাড়ি গিয়ে আবর্জনা জমা রাখতে অনুরোধ করি। যাতে আমরা পরে গিয়ে সংগ্রহ করতে পারি।”

চড়াই-উতরাই রাস্তা 

অপচনযোগ্য বর্জ্যের জন্য এমনই বন্দোবস্ত। সবজির খোসা প্রভৃতি পচনযোগ্য আবর্জনাকে সারে পরিণত করতে চায় কমিটি। ইকোপার্কে সেগুলো বিক্রি করা যাবে। কাজে লাগবে সুন্দর বাগানগুলোয়। আবর্জনা পরিষ্কারের সঙ্গে সঙ্গে পর্যটকদের যাতে কোনো অসুবিধে না হয়, সেদিকেও নজর রাখছেন স্থানীয় বাসিন্দারা। 

কীভাবে যাবেন

লামাহাট্টা যেতে গেলে আপনাকে শিয়ালদহ বা হাওড়া স্টেশন থেকে উত্তরবঙ্গের ট্রেন ধরে নিউ জলপাইগুড়ি স্টেশন পৌঁছতে হবে। আকাশপথে গেলে নামতে হবে বাগডোগরা বিমানবন্দরে। তারপর ভাড়া করতে হবে লামাহাট্টা যাওয়ার গাড়ি। পৌঁছতে সময় লাগবে ঘণ্টা তিনেক। 

কোথায় থাকবেন

লামাহাট্টায় আগে সেভাবে পর্যটকদের থাকার জন্য কোনো বড়ো হোটেল বা রিসর্ট ছিল না দু-একটি হোম-স্টে ছাড়া। এক বছর হতে চললো লামাহাট্টায় গড়ে উঠেছে 'দ্য ওক রিট্রিট – লামাহাট্টা'। থাকার সুবিধের সঙ্গে সঙ্গে এই প্রপার্টিতে রয়েছে একটি মনোগ্রাহি ক্যাফে-লামাহাট্টা ক্যাফে।   

বিস্তারিত জানতে যোগাযোগ করুনঃ

ফোন- ৯৩৮২৩৪২৫৯৭/৯৩৩০৮৩৪৭৭৬
মেইল- theoakhospitality.resv@gmail.com 

Developed by DXDasia