পথ বলে এত লাশ আমি রাখব কোথায়

শিল্পীরা এত দুর্ঘটনায় পড়েন কেন কেন সারি সারি শিল্পী-স্মৃতি আড়চোখ চেয়ে থাকে তাদেরই সর্পিল রক্তধারায়

সেদিন কলকাতা ঘুমিয়ে পড়েছিল নিশ্চিন্ত প্রশান্তিতে। তবু জেগে ছিল রাতের কলকাতা। তারাদের নিঃশব্দ নিশিযাপন, ফাঁকা ফাঁকা পথঘাট। শুধু জেগেছিল ওরা কয়জন, রাতের ক্লাবঘরে। নাগরিক ক্লান্তি ভুলতে গেলাসে গেলাসে জলতরঙ্গ, যাপিত হয়েছিল সেলফি-খচিত অদ্ভুত আঁধার। গ্রীষ্মের তপ্ত বাতাস যামিনীর অন্তিম প্রহরে অনেকটাই মোলায়েম। তখন ওরা বেরিয়েছিল, ২৯ এপ্রিল(২০১৭) প্রায় ভোরে। উদ্দাম গতি ছিল উচ্ছ্বল বাহনের, ফরেনসিক বলছে ঘণ্টায় ১০৫ কিমি। তারপর যে কী হল, কে-ই বা বলতে পারে। দক্ষিণ কলকাতার পথে, লেক মার্কেটে আজও সুন্দরী সোনিকা চৌহানের লবণাক্ত রুধির, কোথা দিয়ে যেন সবার অলক্ষ্যে তা মিশে যায় জীবনানন্দের প্রাণে। কলকাতা কাঁদে।

শিল্পীরা এত দুর্ঘটনায় পড়েন কেন? কেন সারি সারি শিল্পী-স্মৃতি আড়চোখ চেয়ে থাকে তাদেরই সর্পিল রক্তধারায়? ‘হাজার বছর ধরে আমি পথ হাঁটিতেছি পৃথিবীর পথে / সিংহল সমুদ্র থেকে নিশীথের অন্ধকারে মালয় সাগরে / অনেক ঘুরেছি আমি;’… মনে পড়ে রবীন্দ্রোত্তর যুগের শ্রেষ্ঠ কবি জীবনানন্দ দাশকে (১৭ ফেব্রুয়ারি ১৮৯৯ – ২২ অক্টোবর ১৯৫৪)? কবি হাঁটছিলেন, আনমনা হয়ে, ওই একই এলাকায়, দেশপ্রিয় উদ্যানের কাছে। ট্রাম এসে ভেঙে দিয়েছিল কবির শরীর। দিনটা ছিল ১৪ অক্টোবর ১৯৫৪। আটদিন মৃত্যুর মুখোমুখি হয়ে কী ভেবেছিলেন কবি? তারপর পথ চলা থেমে যায় ২২ অক্টোবর। হয়তো জীবন ও মৃত্যুর সীমানায় দাঁড়িয়ে বলেছেন, ‘আবার আসিব ফিরে ধানসিঁড়িটির তীরে – এই বাংলায়…’

বাংলা সিনেমার প্রবাদপ্রতিম শিল্পী ছবি বিশ্বাসের ‘জলসাঘর’, ‘দেবী’, ‘কাঞ্চনজঙ্ঘা’, ‘কাবুলিওয়ালা’ – এসব ছবি না দেখে কি বাংলা সিনেমাকে বোঝা যায়? ছবি বিশ্বাস (১২ জুলাই ১৯০০ – ১১ জুন ১৯৬২) হয়তো আরও অনেক কীর্তি রেখে যেতে পারতেন, যদি না কলকাতায় এক পথ দুর্ঘটনা তাঁর প্রাণ কেড়ে নিত!

প্রাণ যেতে যেতে বেঁচে গিয়েছিলেন প্রখ্যাত সঙ্গীতশিল্পী শ্যামল মিত্র (১৫ জানুয়ারি ১৯২৮ – ১৫ নভেম্বর ১৯৮৭, দুটোই রবিবার)। সেটা ১৯৬৯ সালের ২১ মে, ভোররাত। রাত ৩.২০ মিনিটে তাঁর গাড়ি একটি স্টিম-রোলারে সজোরে ধাক্কা মারে। দুর্ঘটনার আগে তিনি সম্ভবত বিখ্যাত তবলিয়া রাধাকান্ত নন্দী ও অন্য একজন শিল্পীকে বাড়ি নামিয়ে দিয়েছিলেন। তাঁকে শিশুমঙ্গল হাসপাতালে ভর্তি করা হয়, মৃত্যুর সঙ্গে পাঞ্জা লড়ে তিনি ফিরে আসেন। সুস্থ হয়ে তিনি গেয়েছিলেন, ‘তোমাদের ভালবাসা মরণের পার হতে ফিরায়ে এনেছে মোরে…।’

উস্তাদ আমির খানের কথাও ভেবে দেখুন! শাস্ত্রীয় সংগীতে যেমন উচ্চতায় তিনি উঠেছিলেন, তাতে অনেকেই ওই ঘরানার শ্রেষ্ঠ শিল্পীর আসন তাঁর জন্যই চিহ্নিত করেছিলেন। পথ দুর্ঘটনায় তিনি আমাদের ছেড়ে চলে গিয়েছিলেন ১৯৭৪ সালের ১৩ ফেব্রুয়ারি। স্তব্ধ হয়ে গিয়েছিল এক অসাধারণ কণ্ঠ। প্রখ্যাত শাস্ত্রীয় সংগীত শিল্পী উস্তাদ আমির খানের মৃত্যু হয়েছিল কলকাতায় মর্মান্তিক গাড়ি দুর্ঘটনায়, গোবরা কবরস্থানে তিনি চিরশায়িত আছেন (জন্ম ১৯১২, ইন্দোর)।

‘মা মাটি মানুষ’ যাত্রাপালা করেছিলেন যে বিখ্যাত অভিনেত্রী, মনে পড়ে তাঁকে? বীণাপাণি দাশগুপ্ত। রানীগঞ্জে যাত্রা সেরে ফিরছিলেন, ২০০৫ সালের ৯ এপ্রিল শনিবার ভোররাতে। তাঁদের গাড়ি একটি থেমে থাকা ট্রাকে ধাক্কা মারে বর্ধমানের গোদা এলাকায়। ঘটনাস্থলেই মৃত্যু হয় বীণাপাণিদেবীর, সঙ্গে থাকা অপর শিল্পীরা মারাত্মকভাবে আহত হন। ‘নটী বিনোদিনী’, ‘মীরার বঁধুয়া’, ‘অচল পয়সা’ প্রভৃতি তাঁর বিখ্যাত যাত্রা। মৃত্যুর ঠিক আগে রাণীগঞ্জে ‘রাম রহিমের মা’ যাত্রাপালায় শেষবারের মতো অভিনয় করেন বীণাপাণি।

>লোকগীতির নানা শাখায় এক অতি বিশিষ্ট শিল্পীর নাম গৌর খ্যাপা। বিশেষত বাউল ও রাধাকৃষ্ণের প্রেমগীতিতে তিনি ছিলেন অসাধারণ। ২০১৩ সালের ২২ জানুয়ারি শান্তিনিকেতনের কাছে ইলামবাজারে এক মারাত্মক দুর্ঘটনায় পড়েন তিনি। ডাক্তারদের সব চেষ্টা ব্যর্থ করে তাঁর কণ্ঠ থেমে চিরকালের জন্য থেমে গিয়েছিল ২৬ জানুয়ারি।

প্রতিশ্রুতিমান অভিনেতা পীযূষ গঙ্গোপাধ্যায় হাওড়ার সাঁতরাগাছিতে এক ভয়ংকর গাড়ি দুর্ঘটনায় মারাত্মক আহত হন ২০ অক্টোবর ২০১৬। হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছিল, পাঁচ-ছয় দিন মৃত্যুর সঙ্গে পাঞ্জা লড়ে চিকিৎসকদের সব চেষ্টা ব্যর্থ করে ২৬ অক্টোবর রাত আড়াইটে নাগাদ সবাইকে ছেড়ে চলে গেলেন পীযূষ। ‘গয়নার বাক্স’, ‘ল্যাপটপ’, ‘ব্যোমকেশ বক্সী’, ‘ইতি শ্রীকান্ত’-র মতো বেশ কয়েকটি সিনেমা, টিভি সিরিয়ালের খ্যাতনামা অভিনেতার এই যাওয়াটা বিঁধেছিল সংস্কৃতিপ্রেমীদের।

এর মাত্র মাস পাঁচেক পরে ৭ মার্চ ২০১৭ পথ দুর্ঘটনায় নিহত হলেন প্রখ্যাত লোকসংগীত শিল্পী কালিকাপ্রসাদ ভট্টাচার্য। বর্ধমানের পালসিটে তাঁর গাড়ি দুর্ঘটনায় পড়ে। বর্ধমান মেডিক্যাল কলেজে তাঁকে নিয়ে যাওয়া হয়, কিন্তু কালিকাপ্রসাদের ততক্ষণে মৃত্যু হয়েছে। বাংলার লোকগীতি কালিকার কণ্ঠে নতুন করে জনপ্রিয় হচ্ছিল। ‘মনের মানুষ’, ‘জাতিস্মর’, ‘ভুবন মাঝি’ প্রভৃতি অনেক সিনেমায় গেয়েছেন তিনি।
মাস তিনেক আগে অভিনেতা রানা মিত্র ও অভিনেত্রী পায়েল মুখোপাধ্যায় পথ দুর্ঘটনায় মারাত্মক আহত হয়েছেন। ১ এপ্রিল ২০১৭ কলকাতায় পথ দুর্ঘটনায় মারাত্মকভাবে আহত হয়েছেন তরুণ অভিনেতা ও সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়ের নাতি রণদীপ বোস। সময়টা ছিল রাত সাড়ে বারোটা। তিনি এখনও সুস্থ হয়ে ওঠেননি।

এমন আরও উদাহরণ দেওয়া যায়। কিন্তু কেন এমনটা শিল্পীদের জীবনে ঘটে? বেশি রাতে, সারারাত ধরে গাড়ি চালিয়ে চলা এঁদের জীবনের অঙ্গ। শৈল্পিক উদ্বেগ এঁদের অনেককেই তাড়িয়ে নিয়ে বেড়ায়, মদ ও নানা নেশা হাতছানি দেয়। তাছাড়াও রয়েছে তাড়াতাড়ি ফেরার তাগিদ। হয়তো এক অনুষ্ঠানে দেরি হয়ে গিয়েছে, পরের অনুষ্ঠান থেকে তাগাদা আসছে। আবার সব শেষ করে ভোররাতে বাড়ি ফিরতে গিয়ে গাড়ির সব যাত্রী ঘুমোচ্ছে, শুধু ড্রাইভার জেগে চালাচ্ছে। তারও ঝিমুনি আসতে পারে, অন্য সবাই চুপ হয়ে যাওয়াতে টানা গাড়ি চালাতে চালাতে অন্য কথা মনে পড়ে যেতে পারে, অন্যমনস্ক হতে পারেন চালক। তীব্রগতিতে চলা গাড়ির ড্রাইভারের এক লহমার ভুলেই ঘটে যায় মারাত্মক দুর্ঘটনা।

শিল্পীরা, ব্যস্তরা তাই নিজেকে বলুন, ড্রাইভারকেও বোঝান, মনের গতিতে গাড়ি চলে না, যা হয় না, তাকে হওয়াতে গেলেই বিপত্তি। রাত একটা-দুটোর সময় একশো-দুশো কিলোমিটার বেগে গাড়ি চালিয়ে ফেরার ঝুঁকি না নিয়ে বরং ওখানেই রাতটা কাটান না, আসবেন পরের সকালে। তেমনভাবে রুটিনটাও সাজাতে পারেন তো!

Developed by DXDasia