পুষ্পক রথের পর এবার রামসেতু

বাবরি ধ্বংসে অভিযুক্তদের বিচার চলবে। চলবে জনগণের ট্যাক্সের টাকায় ‘অ্যাডামস ব্রিজ’- কে রামসেতু ‘প্রমাণ’-এর চেষ্টাও

প্রধানমন্ত্রী কিছু দিন আগে বিজ্ঞান কংগ্রেসে গিয়ে রামায়ণের পুষ্পকরথের প্রশংসা করে এসেছেন। তিনি বিস্বাস করেন, আদিকালে ভারতে এয়ারপোর্ট টেয়ারপোর্ট ছিল। নিয়মিত বিমান চলাচল করত। রামায়ণে অবশ্য দু’তিনটের বেশি পুষ্পকের উল্লেখ নেই। রাবণ যেটা চড়ত, সেটার আসল মালিক ছিলেন কুবের। কুবেরকে মারধর করে রাবণ সেটা চুরি করে এনেছিল। চুরির রথেই সীতাকে কিডন্যাপ করেছিল রাবণ।রামের হাতে রাবণের পরাজয় এবং মৃত্যুর পর স্বর্গ থেকে পুষ্পকে চেপেই রামের সঙ্গে লঙ্কায় দেখা করতে এসেছিলেন দশরথ। সেটার মালিক কে তা অবশ্য বলা নেই। মনে হয় সর্গে ওসব ফ্রি পাওয়া যায়। আবার রাবণের মৃত্যুর পর রাম রাবণের চুরির পুষ্পকটি বাজে্‌আপ্ত করেন। সেটায় চড়েই তিনি সীতাকে নিয়ে অযোধ্যায় ফিরেছিলেন। তার পর সেটা রামের গ্যারাজেই থাকত। দরকারে তিনি চড়তেন। সীতা পুষ্পক রথে তিন বার উঠেছেন। এক বার কিডন্যাপের সময়। এক বার যুদ্ধে রামের মৃত্যু হয়েছে এই মিথ্যা বলে রাবণ ত্রিজটা রাক্ষসীর সঙ্গে পুষ্পকে করে সীতাকে পাঠিয়েছিলেন আকাশ থেকে রামের মৃতদেহ দেখাতে। কিন্তু ত্রিজটা বিমানে উঠে সীতার কাছে সেই মিথ্যা ফাঁস করে দেয়। এতো গেল পুষ্পকের কথা। এখন আবার একটা নতুন চেষ্টা শুরু হয়েছে। রামসেতুর সত্যতা যাচাইয়ে নামানো হচ্ছে দেশের শীর্ষ জ্ঞানচর্চার কেন্দ্র, ইন্ডিয়ান কাউনসিল অফ হিস্টরিক্যাল রিসার্চকে। জলের নীচে চুনা পাথরের ওই নির্মাণ প্রকৃতির দান, নাকি মানুষের তৈরি সেতু! ঐতিহাসিক এবং বিজ্ঞানীরা খুঁজে দেখবেন সেটাই। বাস্তব ঘটনা হল, তামিলনাড়ুর পন্বন দ্বীপ থেকে শ্রীলঙ্কার মান্নার দ্বীপ পর্যন্ত এই চুনা পাথরের সারিকে বলা হয় ‘অ্যাডামস ব্রিজ’। এর পিছনে নানা বৈজ্ঞানিক কারণের কথা বিশেষজ্ঞরা বিভিন্ন সময়ে বলেওছেন।হিন্দুত্ববাদীরা এই সেতুকে বানর সেনার তৈরি দাবি করে রামকে বাস্তব চরিত্র হিসেবে প্রমাণ করতে চায়, যাতে জয়শ্রীরাম স্লোগানটায় লাগানো যায় ইতিহাসের সিলমোহর। আসলে বিষয়টি যদি সত্যিই সত্যানুসন্ধান হয়, খুবই ভাল কথা। কিন্তু তা হবে কি? প্রধানমন্ত্রী নিজেই যেখানে কোনও প্রমাণ ছাড়াই পুষ্পকরথের প্রশস্তি করেন, সেখানে কেন্দ্রীয় মানব সম্পদ উন্নয়ন দফতরের এই সিদ্ধান্তের প্রকৃত উদ্দেশ্য সম্পর্কে কিছু সন্দেহ তো থেকেই যায়। ভয় সেটাই। ভয় এই কারণেই যে, ২০০৭ সালে বিগত ইউপিএ সরকার সুপ্রিম কোর্টে হলফনামা দিয়ে বলেছিল, ওই সেতু যে মানুষের তৈরি, এমন কোনও প্রমাণ মেলেনি। তার পর ১০ বছর কেটে গেছে। ফের জনসাধারণের ট্যাক্সের টাকা খরচ করে নামা হচ্ছে একই কাজে।

রামসেতু কী ভাবে তৈরি হয়েছিল? রামায়ণ কী বলছে এক বার দেখে নেওয়া যাক। ভারতের মহান এপিক গ্রন্থ রামায়ণ কে জোর করে সত্যি প্রমাণ করার এই প্রচেষ্টার দরকারটা কী? সত্য, কল্প-কাহিনী, কথা, উপকথা সব মিলে মিশে একাকার হয়ে থাকে মহাকাব্যে। রামায়ণ আমাদের মনের মধ্যে আছে। আমরা জেনে না-জেনে কথায় কথায় ‘রাম’ বলে থাকি। ‘এ রাম’ তো আমাদের দিনে কত বার যে বলতে হয় কে জানে! আর এই সব হিন্দুত্বের ঠিকাদারদের গুলিতে বিদ্ধ হয়ে মহাত্মা বলেছিলেন, ‘হে রাম’।

ক্ষুদ্র চিন্তা নিয়ে রাজনীতিতে মহাকাব্যর এই ধরনের ব্যবহার, কার্যত মৌলবাদ। ইসলাম নিয়ে যে মৌলবাদ আমরা দেখি, এটা তার পালটা একটা ধরন।এখনও তার তীব্রতা হয়তো অনেক কম, তবে ক্ষমতা যত বাড়বে এর তীব্রতাও তত বাড়বে। সংখ্যাগুরু মৌলবাদ শেখায় কী করে সংখ্যালঘুকে ভয় পেতে হয়। এর মধ্যে দিয়েই এই সব সংগঠন চেষ্টা করে লিবারেল মতবাদ এবং গণতন্ত্রের উপরে স্থান দিতে ধর্মীয় অনুশাসনকে।

দেখে নেওয়া যাক রামসেতু কী ভাবে তৈরি হয়েছিল। পাঁচ দিনে সেতু তৈরি হয়েছিল ১০০ যোজন দীর্ঘ, ১০ যোজন চওড়া। মানে ৮০০ মাইল দীর্ঘ, ৮০ মাইল চওড়া। এই সেতুর উপর দিয়ে সহস্র কোটি বানর লাফাতে লাফাতে সগর্জনে পার হতে লাগল।বড় বড় পর্বতের মতো, বিরাটাকার হাতির মতো সব বানররা মহারণ্যে গিয়ে গাছ, বিরাট বিরাট পাথর, পাহাড়ের চূড়া, গোটা পাহাড় উপড়ে নিয়ে এসে সমুদ্রে ফেলতে শুরু করল।অর্থাৎ সেতু তৈরি হল কাঠ পাথর আর মাটি দিয়ে। এবং সমুদ্রদেবতা রামকে বললেন, নল ওই সেতু তৈরি করবে এবং ‘আমি তা ধারণ করব’।সমুদ্র তো প্রথমে এই সেতু গড়তে দিতে রাজি হয়নি। পরে রামের ব্রহ্মাস্ত্রের ভয়ে রাজি হয়। কিন্তু সেটা ছিল প্রায় ‘ওটিপি’-র মতো। মানে ওয়ান টাইম পাসওয়ার্ড। যুদ্ধ শেষ হলে সেতু ভেসে যাবে।

তার সবটা নাকি ভেসে যায়নি। ৮০০ মাইলের মধ্যে অ্যাডামস ব্রিজ প্রায় ৩০ মাইল, কোনও ভাবে নাকি টিকে গেছে। দাবি অনেক হিন্দুত্ববাদীর। কিন্তু রামায়ণের সেতু যা যা উপকরণ দিয়ে তৈরি হয়েছিল, অ্যাডামাস ব্রিজ মোটেই সেই সব উপকরণে তৈরি নয়।

Developed by DXDasia