যে স্কুলের ছাত্র ছিলেন রবীন্দ্রনাথ

বাঙালি-প্রতিষ্ঠিত আধুনিক স্কুল। কত গৌরবের ইতিহাস এবং রবীন্দ্রনাথ…

“ওরিয়েন্টাল সেমিনারিতে যখন পড়িতেছিলাম তখন কেবলমাত্র ছাত্র হইয়া থাকিবার যে-হীনতা, তাহা মিটাইবার একটা উপায় বাহির করিয়াছিলাম। আমাদের বারান্দার একটি বিশেষ কোণে আমিও একটি ক্লাস খুলিয়াছিলাম। রেলিংগুলা ছিল আমার ছাত্র। একটা কাঠি হাতে করিয়া চৌকি লইয়া তাহাদের সামনে বসিয়া মাস্টারি করিতাম।”

স্মৃতিচারণায় রবীন্দ্রনাথ লিখছেন তাঁর স্কুলপাঠের অভিজ্ঞতার কথা। সেখানেই উঠে এসেছে কলকাতার এক নামকরা স্কুলের নাম–ওরিয়েন্টাল সেমিনারি। অকালেই সেখানে ভর্তি হয়েছিলেন রবীন্দ্রনাথ। বাড়ির অন্যান্য ছেলেরা দিব্বি সকাল হলেই স্কুলে যেত। রবি ঠাকুর তখন নেহাতই শিশু। স্কুলে যাওয়ার বয়স হয়নি। কিন্তু বাইরে বেরোবার নেশা লেগেছিল ওই ছোটো-অবস্থাতেই। কান্নাকাটি করে, অবশেষে ওরিয়েন্টাল সেমিনারিতে নাম লেখানো।

‘জীবনস্মৃতি’তে ওরিয়েন্টাল সেমিনারির অসাধারণ শাস্তি-প্রক্রিয়াটিরও উল্লেখ করেছিলেন রবীন্দ্রনাথ। পড়া না-পারলে দুটি-প্রসারিত শিশু-হাতে স্তূপাকৃত হত ক্লাসের সমস্ত ছেলের স্লেট। আজকালকার দিন হলে, কর্পোরাল পানিসমেন্ট দেওয়ার অপরাধে মাস্টারের হাজতবাস নিশ্চিত। ওরিয়েন্টাল সেমিনারির শাসনপ্রণালি মেনেই লোহার রেলিংগুলোকে মেরে-মেরে সিধে করতেন রবীন্দ্রনাথ। ‘স্কুল’-এর প্রতি তাঁর চিরকালীন অপছন্দের কারণগুলি এখান থেকেই আন্দাজ করে নেওয়া যায়। 

খোদ রবীন্দ্রনাথ যে স্কুলে পড়েছেন, তা নেহাত সাদামাটা স্কুল হতে পারে না। ওরিয়েন্টাল সেমিনারিও যে-সে স্কুল ছিল না। এমনিতে, খ্রিস্টান মিশনারিরা কলকাতার অলিগলিতে স্কুল বানাচ্ছিল তখন। প্রথম স্কুলটি বোধহয় সেন্ট থমাস স্কুল। খিদিরপুর অঞ্চলে এটি স্থাপিত হয় ১৭৮৯ সালে। উদ্দেশ্য ছিল, প্রবাসে বাসরত খ্রিস্টান ছেলেপুলেদের শিক্ষালাভের উপায় করে দেওয়া। তারপর থেকে হেয়ার সাহেবের স্কুল, হিন্দু স্কুলসহ আরো কয়েকটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান  তৈরি হয় কলকাতায়। ইতিমধ্যে টোল বা গ্রামের প্রসন্ন গুরুমশায়দের পাঠশালা যে বেশ খারাপ, অন্তত তা বনেদিয়ানার সিম্বল নয়-– তা লোকজন মোদ্দায় বুঝে নিয়েছে। টাকা থাকলেই কলকাতার সাহেব-স্কুলে পাঠানো হত ছেলেদের। অবশ্য তাতে ইংরেজি  শিখলেও ছেলেদের বিধর্মী, ম্লেচ্ছ হয়ে যাওয়ার সম্ভাবনাও থাকত। ফলে রক্ষণশীল হিন্দু পরিবারের দুশ্চিন্তা কাটত না। এহেন প্রেক্ষাপটেই তৈরি হল ওরিয়েন্টাল সেমিনারি। আধুনিক শিক্ষায় পড়াশোনা, ইংরেজি পাঠের সুযোগ মিলবে এখানে। অথচ মিশনারিদের হাতে তৈরি নয়। ‘ওরিয়েন্টাল’ শব্দবন্ধের আড়ালে এদেশীয়দের নিজস্ব ভাষ্য, বয়ানের ছাপ ছিল স্পষ্ট। সবটা মিলিয়ে দেখলে তৎকালীন কলকাতার প্রেক্ষিতে বেশ ব্যতিক্রম।

এই স্কুল নির্মাণ করেছিলেন বিশিষ্ট শিক্ষাবিদ গৌরমোহন আঢ্য (১৮০৫-১৮৪৬)। কলকাতায় ব্যক্তিগত উদ্যোগে গড়ে ওঠা প্রথম স্কুল এটিই। হিন্দুস্কুলকেও বেশ কিছু সরকারি নিয়মকানুন মানতে হত। কিন্তু ওরিয়েন্টাল সেমিনারির একেবারেই সেই দায় ছিল না। এছাড়া গৌরমোহনবাবু সমস্তরকম ধর্মীয় প্রভাব থেকে স্কুলকে মুক্ত রাখতে পেরেছিলেন। কোনোরকম ধর্মশিক্ষা স্কুলে দেওয়া হত না। সেদিক থেকে বলতে গেলে দেশীয় সংস্কৃতিকে অক্ষুণ্ণ রেখে ইউরোপীয় চিন্তাধারার সঙ্গে একটা মেলবন্ধন রক্ষা করতে পেরেছিলেন তিনি।

 

স্কুলের শিক্ষক নিয়োগের ক্ষেত্রেও অত্যন্ত সচেতন থাকতেন তিনি। উচ্চশিক্ষিত বাঙালি বা ইংরেজ দুই জাতির লোকই শিক্ষকতা করতেন। যেমন শেক্সপিয়র বিশেষজ্ঞ ও হিন্দু কলেজের অধ্যক্ষ ক্যাপ্টেন ডি এল রিচার্ডসন ১৮৫০ সালে শিক্ষকতা করেছিলেন এই স্কুলে। সেই শিক্ষক খোঁজার কাজেই গৌরমোহন একবার গিয়েছিলেন শ্রীরামপুর। সেখান থেকে কলকাতা ফেরার পথে হুগলী নদীতে নৌকাডুবিতে মৃত্যু হয় তাঁর। 

কলকাতা থেকে দ্রুত লোপাট হয়ে যাচ্ছে অতীত, তারমধ্যেও নিজেকে টিকিয়ে রেখেছে রবীন্দ্রনাথের স্মৃতিবিজড়িত এই স্কুল। বর্তমানে, চিৎপুর রোডে (অধুনা রবীন্দ্র সরণী) দাঁড়িয়ে এই স্কুলের বিরাট কলেবর। জোড়াসাঁকো ঠাকুরবাড়ি থেকে খুব দূরে নয়। তবে, ১৮২৯-এ গৌরমোহন কিন্তু একে প্রতিষ্ঠা করেছিলেন মানিক বোস ঘাটের কাছে, গঙ্গার পাড়ে। তারপর তিন-তিনবার স্থান পরিবর্তন করে অবশেষে চিৎপুর রোডের ঠিকানায় পাকাপাকি অবস্থান।

১৮৫৪ সালে ওরিয়েন্টাল সেমিনারির ছাত্ররা মিলেই তৈরি করেছিল ‘দ্য ওরিয়েন্টাল থিয়েটার’। শেক্সপিয়রের ‘মার্চেন্ট অব ভেনিস’ অভিনীত হয়েছিল এখানে। অভিনেতাদের মধ্যে অন্যতম ছিলেন উমেশচন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায়। ওরিয়েন্টাল সেমিনারির প্রথম প্রেসিডেন্টও ছিলেন উমেশচন্দ্রই।  একটি ভরাডুবির হাত থেকে নিজের স্কুলকে রক্ষা করেছিলেন তিনি। ১৮৯০-এর দশকে স্কুলের সম্পাদক ব্রজগোপাল চট্টোপাধ্যায় বিক্রি করে দিতে চেয়েছিলেন স্কুলটিকে। উমেশচন্দ্র হাইকোর্টে মামলা লড়ে সেই বিক্রি ঠেকান।

ওরিয়েন্টাল সেমিনারির গুণী ছাত্রদের তালিকাও কিন্তু বেশ ভারী। নাট্যকার গিরিশ ঘোষ থেকে শুরু করে অমৃতলাল বসু, কবি যতীন্দ্রনাথ সেনগুপ্ত, সুধীন্দ্রনাথ দত্ত, হাল-আমলের মলয় রায়চৌধুরী ছাত্র ছিলেন এখানকার। এছাড়া, অক্ষয় কুমার দত্ত, কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রথম উপাচার্য স্যার গুরুদাস ব্যানার্জী, ব্যারিস্টার বিশ্বনাথ দত্ত (বিবেকানন্দর পিতা)–- সব মিলিয়ে কৃতি ছাত্রের তালিকা সুদীর্ঘ। স্কুলের আর্কাইভ জুড়ে রয়েছে স্কুলের সেই সমৃদ্ধ ইতিহাসমালা। রয়েছে অনেক গুরুত্বপূর্ণ নথি , যা নগর কলকাতার প্রথমদিককার আলোকময় ইতিহাসকে ধারণ করে রেখেছে। 

ওরিয়েন্টাল সেমিনারি এখন সর্বশিক্ষা প্রতিষ্ঠানের আওতাভুক্ত একটি সরকারি স্কুল। কলকাতা জুড়ে বেড়ে চলা গিজগিজে প্রাইভেট স্কুলের ভিড়ে এই স্কুল যে এখনও বেঁচে, এই ঢের। অবশ্য, হেয়ার বা হিন্দু স্কুলের মতো জনপ্রিয়তা বর্তমানে আর নেই এই স্কুলের। ইতিহাসের নিরিখে দেখলে এমনটা হওয়ার কথা ছিল না। অবশ্য, এমন কত কথা না থাকার ইতিহাসও কলকাতার চারপাশে ঘন হয়ে আছে। বাঙালি-প্রতিষ্ঠিত একটা আধুনিক শিক্ষার স্কুল লালমুখো সাহেবদের তৈরি করা মিশনারি স্কুলগুলোর সঙ্গেও পাল্লা দিচ্ছে পাঠ্যক্রমের মানদণ্ডে, শিক্ষাদানের পদ্ধতিতে, ধর্মান্ধতার উল্টোপিঠেও তৈরি করতে চাইছে একটা উন্নত, মুক্ত বয়ান— কলকাতা থুড়ি বাংলার শিক্ষা-সংস্কৃতির ইতিহাসে ওরিয়েন্টাল সেমিনারির অবদান নেহাত কম নয়। রবীন্দ্রনাথের স্মৃতি বাদ রেখেও এই স্কুল তাই দিব্যি লীন হতে পারে নিজের গৌরবে। আর আমরা? পরের প্রজন্মকে পাঠাব কি সেই ইতিহাসের দালানে?

প্রশ্নগুলো সহজ আর উত্তরও তো…

Post Tags
Developed by DXDasia